আপনি কি জানেন সেরিবেলাম , কর্ণের মতো পায়ের গোড়ালি ও দেহের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ? এর সুস্হতা শুধু হাঁটা-চলা, দৌড়ঝাপ নয় বরং ব্যক্তিত্বকেও প্রভাবিত করে।কেননা, গোড়ালি ফাটলে প্রাত্যহিক জীবনে চলাচল যেমন দুষ্কর হয়ে ওঠে তেমনি পাবলিক প্লেসে প্রয়োজনে জুতা খুলে বসাটাও তখন লোকলজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।অনেকের ধারণা, শুধু শীত ঋতু ই গোড়ালি ফাঁটার জন্য দায়ী,কিন্তু ব্যপারটা আসলে তেমন নয়।ডায়াবেটিস, পানিশূন্যতা,দূষণ, লাইফস্টাইল,অবেসিটি, প্রয়োজনীয় যত্নের অভাব এসবের জন্যে ও গোড়ালি ফেঁটে থাকে এমনকি কালো,রুক্ষ পর্যন্ত হয়ে যায়।

তবে সঠিক যত্ন আত্তি ও সর্তকতা অবলম্বন করলে গোড়ালি ফাটা ও শুকনোভাব থেকে মুক্তি পাওয়া খুবই সহজ।আর আজকের ব্লগে আমরা গোড়ালি ফাটা, কালো ও শুকনোভাব দূর করার প্রাকৃতিক উপায় সম্পর্কেই আলোচনা করব। পাঠক আপনি যদি অনেকের মতো গোড়ালির ফাঁটার এ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে থাকেন তবে আজকের ব্লগটি আপনার জন্যে হতে পারে এক উপযোগী আয়োজন। চলুন তাহলে দেরি না করে এবার জেনে নেয়া যাক গোড়ালি ফাটা,কালো ও শুকনো ভাব দূর করার ন্যাচারাল উপায় –

পিউমিস স্টোন ব্যবহার
প্রতিদিন নানা কাজে আমাদের বাহিরে বের হতে হয়।তখন পায়ে ধুলোবালি,ময়লা,ঘাম জমা হয় যার দরুন গোড়ালি ফাটে,কালো,খসখসে হয়ে যায়।তাই এগুলো তুলে ফেলতে গোসলের সময়,পা পরিষ্কারে পিউমিস স্টোন ব্যবহার করুন।
ব্যবহারের নিয়ম
প্রথমে কুসুম গরম পানিতে ১০ মিনিট পা ভিজিয়ে রাখুন। এবার পায়ে আলতো করে সাবান বা শ্যাম্পু মেখে পিউমিস স্টোন ঘষে নিন।দেখবেন পায়ের মৃতকোষ দূর হয়ে নরম,উজ্জ্বল হবে।
মোজা ব্যবহার করুন
গোড়ালি ময়েশ্চারাইজ করার সাথে সাথেই কখনো জুতা পরিধান করবেন না বা উন্মুক্ত অবস্থায় রাখবেন না। কারণ এতে ময়েশ্চার উঠে যায়।বরং তেল ম্যাসাজ করার পর নরম সুতি কাপড় বা মোজা দিয়ে ঢেকে রাখবেন ।এতে ময়েশ্চারা লক থাকবে,গোড়ালি ও ফাটবে না।

রোজ ওয়াটার ফুট মাস্ক
গোলাপ জলে এ রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট যা কোষ ড্যামেজ রিপেয়ার করে।এছাড়াও রয়েছে এন্টি ইনফ্ল্যামেটরী প্রোপারটিস যা,শুষ্কতা,চুলকানি প্রতিরোধ করে।তাই গোড়ালি ফাটা রোধ সহ কালোদাগ দূর করে কোমলতা বৃদ্ধির জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকরী একটি মাস্ক।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
- ১ টেবিলচামচ লবণ
- ২ টেবিলচামচ গ্লিসারিন
- ২ টেবিলচামচ গোলাপজল
- কুসুম গরম পানি
- ফুট স্ক্রাবার
বানানোর উপায় ও ব্যবহারবিধি
একটি বোল(bowl) এ গরম পানি গ্লিসারিন, গোলাপজল ও লবণ ঢেলে মিশিয়ে নিন।তৈরি হয়ে গেল রোজ ওয়াটার ফুট মাস্ক।এবার এতে ১৫ মিনিট পা ভিজিয়ে রাখুন।১৫ মিনিট পর ফুট স্ক্রাবার দিয়ে ঘষে নিন।গোড়ালি হয়ে ওঠবে প্রাণবন্ত,সফট।এ মাস্ক সপ্তাহে তিন দিন ব্যবহার করুন।

সিসেমি অয়েল ম্যাসাজ
এটি ত্বকের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে,দাগ তুলে ফেলতে সাহায্য করে।নিয়মিত ব্যবহারে গোড়ালি নরম হয়,ফেটে যায় না,উজ্জ্বল থাকে।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
৪/৫ ফোঁটা সিসেমি অয়েল
ব্যবহারবিধি
রাতে ঘুমানোর পূর্বে হাতে অয়েল নিয়ে পুরো পায়ে উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ম্যাসাজ করুন।দৈনিক ৫–১০ মিনিট ম্যাসাজ করলেই যথেষ্ট।এটি চুলে ও ব্যবহার করতে পারেন।
ওজন নিয়ন্ত্রণ
ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের মতো সমস্যা থাকলে গোড়ালি ফাটতে ,কালো,রুক্ষ হয়ে যেতে পারে । প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ,অলস জীবনযাপন ইত্যাদি ডায়াবেটিস,থাইরয়েডের অন্যতম কারণ।এজন্য ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিমিত আহার গ্রহণ করুন,কায়িকশ্রম করুন,শরীরচর্চা ও খেলাধুলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

প্রয়োজনীয় ভিটামিন গ্রহণ
ভিটামিন সি, ই ও বি–১৩ এর অভাবে পা ফাটে, শুষ্ক হয়ে যায়।তাই গোড়ালি সুস্থ রাখতে এসকল ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার,যেমন– লেবু,পেয়ারা,ডিম,দুধ,সূর্যমুখীর বীজ,সয়াবিন,পিনাট বাটার ইত্যাদি খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করুন।
অতিরিক্ত টাইট জুতা পরিহার
খুব বেশি ফিটিং জুতা পড়লে এর ঘর্ষণে চামড়া খসখসে হয়ে যায়,পা ঘেমে যায়।ফলে গোড়ালির ফাটা ও বৃদ্ধি পায়।এজন্য গোড়ালি সুস্থ রাখতে যে স্টাইলের জুতাই ব্যবহার করুন না কেন তা যেন সঠিক মাপের সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন।

ল্যাভেন্ডার ও অলিভ অয়েল ম্যাসাজ
ল্যাভেন্ডার এ রয়েছে এন্টি সেপটিক প্রোপার্টিস যা ত্বককে পুনরুজ্জীবিত করে,মোলায়েম রাখে।তাই যারা পা ফাটার সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য অলিভ ও ল্যাভেন্ডার অয়েল হতে পারে এক অনন্য সমাধান।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
- ১ টেবিলচামচ অলিভ অয়েল
- ৪/৫ ফোঁটা ল্যাভেন্ডার অয়েল
ব্যবহারবিধি
দুটি তেল একত্রে মিশিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার আগে হালকা গরম পানি দিয়ে পা ধুয়ে ভালো করে দুটি পায়ে ম্যাসাজ করে নিন।সকালে উঠে দেখবেন পা ফাটা কমে এসেছে ,স্কিন ও আগের তুলনায় সফট হয়ে যাবে।
পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ
দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির অভাব শুধু গোড়ালি নয় পুরো শরীরকে শুষ্ক করে তোলে।তাই শরীরকে হাইড্রেট রাখতে শুধু পানি নয়,পানি জাতীয় ফলও সবজি,যেমন-নারিকেল,তরমুজ,শসা,কমলালেবু,আনারস ইত্যাদি ও খেতে হবে।তাহলে গোড়ালি নরম থাকবে,ফাটলও ধরবে না।

হলুদ ও যষ্টি মধুর মাস্ক
যস্টি মধুতে আছে এন্টি ইনফ্ল্যামেটরী ও এন্টি মাইক্রোবিয়াল প্রোপারটিস যা ব্যাকটেরিয়া ও ইনফেকশন প্রতিরোধ করে। আর হলুদ ত্বককে উজ্জ্বল করে, এছাড়া চুলকানি দূর করার পাশাপাশি ত্বককে কোমল রাখতে ও সাহায্য করে।তাই হলুদ ও যষ্টিমধুর এ মাস্ক গোড়ালির ফাটা, শুষ্কতা ও কালোদাগ দূর করার এক সহজ,স্বল্পব্যয়ী ঘরোয়া সমাধান।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
- ২ চামচ যষ্টি মধুর গুড়া
- ১ চামচ মধু
- ১ চামচ হলুদ
- কয়েক ফোঁটা লেবুর রস
ব্যবহারবিধি
সবগুলো উপকরণ ভালো করে মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করুন। এবার হাতের সাহায্যে গোড়ালিতে মিশ্রণটি লাগিয়ে ১০/১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এবার ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। তারপর অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিবেন।এ মাস্কটি সপ্তাহে দুই বা তিনদিন ব্যবহার করতে হবে।

দীর্ঘ সময় গোসল, এক্সফোলিয়েট পরিহার
অতিরিক্ত কোনো কিছু ই ভালো নয়।অনেকেই আছেন যারা ৩০/৪০ মিনিট যাবত গোসল করেন,প্রতিদিন এক্সফোলিয়েট করেন।এতে করে ত্বকের ময়েশ্চার গ্রহণ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়,ফলে ত্বকে চুলকানি বেড়ে যায়,বিভিন্ন চর্মরোগ দেখা দেয়।তাই গোড়ালি সুস্থ রাখতে রুটিন অনুযায়ী এক্সফোলিয়েট ও গোসলের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
কলার মাস্ক
কলাতে রয়েছে ভিটামিন এ, সি ও বি–৬ যা ত্বকের ইলাস্টিসিটি বৃদ্ধি করে, স্কিনকে হাইড্রেটেড রাখে।তাই গোড়ালির জন্য প্রাকৃতিক ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কলা ব্যবহার করুন।
প্রয়োজনীয় উপকরণ
- কয়েক টুকরো পাকা কলা
- ১ চামচ মধু
বানানোর উপায় ও ব্যবহারবিধি
ব্লেন্ডার এ কলা ঘন করে ব্লেন্ড করে নিন। এতে মধু যোগ করুন।এখন এ মিশ্রনটি গোড়ালিতে মেখে ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর প্রথমে কুসুম গরম ও পরে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।পা হয়ে উঠবে নরম,প্রাণবন্ত।যদি আপনার গোড়ালিতে কালো ছোপ ছোপ দাগ থাকে তবে এ মাস্ক এর সাথে লেবুর রস ও মিশিয়ে নিতে পারেন।এতে ভালো ফল পাবেন। এটি সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন ব্যবহার করতে পারেন।

পাঠক আলোচনা শেষে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন খুব বেশি নয় একটু সচেতনতা আর ঘরোয়া কিছু উপাদান এর সঠিক ব্যবহারে সহজেই গোড়ালি ফাটা, কালোদাগ এর মত সমস্যা থেকে পাওয়া সম্ভব।সংসারের বা অফিসের চাপে প্রতিদিন সম্ভব না হলে ও অন্তত সপ্তাহে দুই দিন নিজের যত্নের জন্য বরাদ্দ রাখুন।দেখবেন,পায়ের সুস্হতা নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে নিজেকে আগের চেয়েও বেশি প্রাণচঞ্চল,প্রশান্ত অনুভব করবেন।আর অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যত্নের ক্ষেত্রে যেন ক্যামিকেল ব্যবহারের মতো ভয়ংকর ভুল না হয়।কারণ এতে সাময়িক লাভ হলেও দীর্ঘস্হায়ী ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি– ফ্রিপিক
https://www.stylecraze.com/articles/simple-home-remedies-for-cracked-heels/