চলছে ফিফা বিশ্বকাপ। রাত জেগে খেলা দেখায় মেতে উঠবেন সবাই। এ নির্ঘুম জাগরণে কম বেশি প্রায় সবার চোখের নীচে ডার্ক সার্কেল জমে। চিন্তা তখনই হয় যখন এ সাময়িক ব্যপারটি অনেকের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠে। আসলে ডার্ক সার্কেলের অনেক কারণ রয়েছে। এটা সবসময় ঘুমের অভাব থেকে হয় না। কেননা, অবসাদ,অতিরিক্ত ওজন, ভিটামিনের অভাব,বংশগত, এলার্জি বিভিন্ন কারণে কিছু কিছু মানুষের চোখে সারাবছরই ডার্ক সার্কেল দেখা যায়। এগুলো মানুষের শারীরিক অসুস্থতার বহিঃপ্রকাশ তো বটেই সেই সাথে পুরো অবয়বকে বেমানান করে তোলে।

তাই এ ডার্ক সার্কেল ঢেকে রাখতে মানুষের প্রচেষ্টার কমতি নেই। কেউ হয়তো নামীদামী ফাউন্ডেশন ব্যবহার করছেন আবার কেউ হয়তো বাজারের চটকদার ক্রীম, লোশন ব্যবহার করছেন। কিন্তু এর কোনোটাই স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না বরং মানুষের অজান্তে তাদের শরীরে ক্যামিকেলের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।অথচ কোনোরুপ ঝুঁকি ছাড়াই হাতের কাছে রয়েছে ডার্ক সার্কেল দূর করার প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া সমাধান। এ সমাধানগুলো যেমন সহজসাধ্য তেমনি চটজলদি ও স্বল্প ব্যয়ী। আজকের ব্লগে আমরা চোখের চারপাশে কালো দাগ দূর করার প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া উপায়গুলো সম্পর্কে আলোচনা করবো। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক –
প্রয়োজনীয় ভিটামিন গ্রহণ
ভিটামিন এ,ডি,কে এবং বি-১২ এর অভাবে চোখের চারপাশে কালো দাগ সৃষ্টি হয়।তাই ব্ল্যাক স্পট দূর করে চোখ সুন্দর রাখতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন এ,ডি,কে এবং বি-১২ যুক্ত খাবার,যেমন-দুধ,পালংশাক,পনির, ব্রকলি, মুরগির মাংস, স্যামন মাছ ইত্যাদি গ্রহণ করুন।

চোখের ব্যয়াম
বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রায় সবাই দিনের বেশিরভাগ সময় মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারে ব্যয় করে থাকে । কিন্তু এগুলোর লাগামহীন ব্যবহার চোখের দৃষ্টিশক্তিকে যেমন ব্যাহত করে তেমনি ডার্কসার্কেলও তৈরি করে। তাই কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু হালকা ৫/৭ মিনিট চোখের রিলাক্সেশন ব্যয়াম বা ম্যসাজ করে নিন। এতে চোখ সুস্থ থাকবে,ডার্কসার্কেলও পড়বে না।
অ্যালকোহল,ধূমপান পরিহার
আপনি কি জানেন ? টোবাকোতে রয়েছে বিষাক্ত ক্যামিকেল যা রক্ত সঞ্চালনে বাঁধা সৃষ্টি করে? এছাড়াও অ্যালকোহলে থাকা টক্সিন রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে আনে। ফলে চোখের চারপাশ ফুলে যায়,কালোদাগ তৈরি হয়। রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অ্যালকোহল,ধূমপানের মতো বাজে অভ্যাস চিরতরে পরিহার করুন।
আলুর জুস ব্যবহার
আলুতে রয়েছে এজাইলিক এসিড যা পিগমেন্টেশন রিমুভ করে। ডার্ক সার্কেল কমিয়ে আনতে তাই আজই আলুর ব্যবহার শুরু করুন।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
১/২ টুকরো আলু থেতলে এর রস বের করে নিন। এবার কটনপ্যাড এর সাহায্যে এর রস কালোদাগ এর উপর লাগিয়ে ১০ মিনিট শুয়ে থাকুন। ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি সপ্তাহে তিন বা চারদিন ব্যবহার করতে পারেন।

সুইট আমন্ড অয়েল
এতে রয়েছে এমোলিয়েন্ট প্রোপারটিস যা স্কিন এর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে, দাগ ছোপ হালকা করে।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
২-৩ ফোঁটা আমন্ড অয়েল হাতের আঙ্গুল এ নিয়ে নিন। এবার এটি চোখের চারপাশে ম্যাসাজ করে সারারাত রেখে দিন। সকালে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দৈনিক ব্যবহারে ভালো ফল পাবেন।
ন্যাচারাল মেক–আপ রিমুভার
ইনস্ট্যান্ট আই মেকআপ (Instant eye make up) তুলতে আমরা ক্রীম, লোশন বা ক্যামিকেল ব্যবহার করি, যা সময় সাশ্রয় করলেও ত্বকের স্হায়ী ক্ষতি, যেমন- ডার্ক সার্কেল,বলিরেখা ইত্যাদির কারণ। তাই একটু সময় নিয়ে হলেও চোখের চারপাশে কালো দাগ দূর করতে ন্যাচারাল মেকআপ রিমুভার, যেমন-রোজওয়াটার, কোকোনাট অয়েল, শিয়া বাটার,মধু ইত্যাদি ব্যবহার করুন।

পর্যাপ্ত ঘুম
ঘুম এর সময় আমাদের শরীর ড্যামেজ সেল রিপেয়ার করে ও নতুন কোষ তৈরি করে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে শরীরের এ স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ফলে চোখের চারপাশে কালি, বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই ডার্ক সার্কেল দূর করতে প্রতিদিন ৮ ঘন্টা ঘুমাতে হবে।
গ্রীন টি ব্যাগ
গ্রীন টি তে রয়েছে ফেনোলিক কম্পাউন্ডস যা মেলানোজেনেসিস দমন করে। এতে করে পিগমেন্টেশন, ডার্ক সার্কেল রিমুভ হয়।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
দুটি গ্রীন টি ব্যাগ নিয়ে সেগুলো পানিতে ডুবিয়ে রাখুন। তারপর এগুলো কিছু সময়ের জন্য ফ্রীজে রেখে ঠান্ডা করে নিন। এরপর ব্যাগ দুটি চোখে দিয়ে শুয়ে থাকুন। ১০ মিনিট পর পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে নিন। ডার্ক সার্কেল চলে যাওয়া পর্যন্ত এটি প্রতিদিন ব্যবহার করতে পারেন।

শশার রস
শশাতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট ও স্কিন লাইটেনিং এজেন্ট। এটি যে কোনো কালোদাগ দূর করতে সাহায্য করে,ত্বক উজ্জ্বল করে। চোখের কালোদাগ সেই সাথে বলিরেখা দূর করতে শশার রস অত্যন্ত উপকারী।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
শশার রস ফ্রিজে রেখে দিন। ঠান্ডা হলে তুলোর সাহায্যে চোখে লাগিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
ঠান্ডা দুধ
দুধ ল্যাকটিক অ্যাসিড(lactic acid) আছে যা ত্বকের জন্য খুব উপকারী। এটি বলিরেখা দূর করার পাশাপাশি কালচে ছোপ ছোপ দাগ দূর করে। ডার্ক সার্কেল দূর করতে চাইলে তাই দৈনিক দুধ ব্যবহার করুন।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
একটি বোল(bowl) এ ঠান্ডা দুধ নিন। এবার কটন প্যাড দুধে ভিজিয়ে চোখে লাগিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। কুসুম গরম পানি দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন।

পুদিনাপাতা
এতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন- সি যা ত্বক সুস্থ রাখে, দাগ হালকা করে। শুধু চোখের চারপাশে কালো দাগ নয় ফোলাভাব ,ক্লান্তি দূর করতে পুদিনাপাতা খুব কার্যকরী।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
পুদিনাপাতা থেতলে এর সাথে অল্প একটু টমেটোর রস মিশিয়ে চোখে দিয়ে ১৫ মিনিট শুয়ে থাকুন। এরপর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। ভালো ফল পেতে সপ্তাহে দুই দিন ব্যবহার করুন।
স্কিপ এক্সেসিভ সল্ট
খাদ্য তালিকায় অতিরিক্ত পরিমাণ সোডিয়াম ওয়াটার রিটেনশনকে বাড়িয়ে দেয় যা ডার্ক সার্কেল তৈরি করে। তাই চোখের কালি মুছে ফেলতে কাঁচা লবণ বা অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ
বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে স্ট্রেস হাইপার পিগমেন্টেশন এর কারণ। তাই যে কোনো কালো দাগ তথা ডার্ক সার্কেল দূর করতে সবসময় ইতিবাচক চিন্তা ,খেলাধুলা, ভ্রমণ, বই পড়া, গাছ লাগানো ইত্যাদি অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ করুন।
অ্যালোভেরা জেল
অ্যালভেরা ননটক্সিক হাইপার পিগমেন্টেশন ট্রিটমেন্ট হিসেবে কাজ করে। কারণ এতে রয়েছে এন্টি অক্সিডেন্ট ও স্কিন লাইটেনিং এজেন্ট। এজন্য চোখের বলিরেখা, কালোদাগ তুলে ফেলতে নিয়মিত অ্যালোভেরা জেল ব্যবহার করুন।
প্রয়োগ করবেন যেভাবে
অ্যালোভেরা কেটে এর ভেতরের পিচ্ছিল অংশ বের করে নিন। এবার চোখের উপর এটি লাগিয়ে রাখুন ৭/৮ মিনিট।তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি প্রতিদিন ব্যবহার করতে পারবেন।

কোকোনাট অয়েল
কোকোনাট অয়েল ন্যাচারাল ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। এতে আছে লাউরিক এসিড যা কালচে ছোপ ছোপ দাগ,ব্রণের দাগ, গর্ত, বলিরেখা ইত্যাদি দূর করতে অত্যন্ত উপযোগী। যাদের চোখের চারপাশ কালো হয়ে যাচ্ছে, চামড়া কুচকে যাচ্ছে তারা ঘুমাতে যাওয়ার আগে ডার্ক সার্কেলে নারিকেল তেল ম্যাসাজ করে ঘুমাবেন। এটি ত্বক ও চুলের জন্য ও নিয়মিত ব্যবহার করতে পারেন।
কুইক টিপস
সাময়িক ডার্ক সার্কেল দূর করতে ছোট্ট একটি রুমাল ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে চোখে জড়িয়ে রাখুন ১৫ মিনিট।দিনে ৩-৪ বার এ পদ্ধতি অবলম্বন করুন।

পাঠক এলার্জি, হরমোনাল ইমব্যালেন্স, থাইরয়েড, জেনেটিকস বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতার কারণে ও ডার্ক সার্কেল হতে পারে। তাই উপরে উল্লেখিত উপায় অবলম্বন করার পর ও যদি অবস্হার পরিবর্তন না হয়, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। কেননা, চোখ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দেয়া মহামূল্যবান নিয়ামত। এ নিয়ামত এর শুকরিয়া আদায় তথা যত্ন নিতে কোনোরুপ হেলাফেলা পুরো জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে চোখের যত্ন নিন, জীবনকে উপভোগ করুন।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি– ফ্রিপিক