নারকেল তেলের সাবান কিভাবে এল? নারকেল ফলটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত। চোখের সামনে ডাব দেখলেই আমরা দাঁড়িয়ে যাই। ডাবের পানি পান করি। নিজেকে তৃপ্ত করি। এছাড়াও প্রচন্ড গরমে এবং শারীরিক অসুস্থতায় ডাবের পানি আমাদের জীবনে স্বস্তি ও সুস্থতা আনে। নারকেল ডাব থেকেই হয়। অত্যন্ত সুস্বাদু ফল। কখনো আমরা নারকেল কচকচ করে খাই। কখনো আবার কোনকিছুর সাথে মিলিয়ে খাই। নারকেল আমাদের খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়।

নারকেল তেল তো কমবেশি আমরা সবাই ব্যবহার করি। চুলের যত্নে মাথায় নারকেল তেল দিয়ে থাকি। শরীরের যত্নে নারকেল তেল দিয়ে খাবার রান্না করে খাই। নারকেল তেলে প্রচুর পরিমাণে লরিক অ্যাসিড রয়েছে। যে লরিক অ্যাসিডে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটারি উভয় বৈশিষ্টে আছে। লরিড অ্যাসিডের কারণে আমাদের শরীরের ফ্যাট বার্ন হয়, কলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং খাবার সহজে হজম হয় ইত্যাদি।প্রাচীনকালে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ অঞ্চলের মানুষ সাবানের সাথে নারকেল তেল মিশিয়ে ব্যবহার করতো। এতে তাদের শরীর ভালোই পরিষ্কার হতো। ত্বকও ভালো থাকতো। তারা নারকেল তেল ঔষধ হিসেবেও ব্যবহার করতো।
বর্তমান যুগের আধুনিক মানুষ মাথায় তেল দিতে চায় না। রান্নায় নারকেল তেল ব্যবহার করতে চায় না। শারীরিকভাবে তারা নানান রোগে আক্রান্ত। এজন্য সৃজনশীল উদ্যোক্তারা নারকেল তেল দিয়ে প্রাকৃতিক সাবান তৈরি করা শুরু করলেন। ভাবলেন, মানুষকে যেভাবেই হোক নারকেলের মাধ্যমে উপকৃত করতে হবে। মানুষকে রোগমুক্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে। উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ সফল হয়েছে। মানুষকে তারা নারকেলের প্রাকৃতিক সাবান ব্যবহার করাতে পারছে। আজকের লেখায় নারকেলের সাবান ব্যবহারে কীভাবে মানুষের শরীর উপকৃত হচ্ছে, বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

নারকেল তেলের ধরন:
নারকেল তেলের সাবানের আলোচনায় যাওয়ার আগে নারকেল তেল সম্পর্কে আলোচনা করছি। প্রথমেই নারকেল তেলের ধরন।ভার্জিন নারকেল তেল: যে নারকেল শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড দিয়ে পরিশোধন করা হয়, তাকে খাঁটি বা ভার্জিন নারকেল তেল বলে। এটাকে কুমারী বা অতিরিক্ত কুমারী নারকেল তেলও বলে। এ নারকেল তেল সবচেয়ে কম উপাদান দিয়ে তৈরি হয়। এজন্য এটা সবচেয়ে বিশুদ্ধ। এ তেলে নারকেলের ঘ্রাণ বজায় থাকে এবং পুষ্টি ও ভিটামিনও বেশি পরিমাণে থাকে।
RBD নারকেল তেল: এ নারকেল তেল পরিশোধন করা হয় ব্লিচ ও ডিওডোরাইজড দিয়ে। পরিশোধন করার জন্য এখানে উপাদান বেশি ব্যবহার করায় এ তেল ভার্জিন তেলের মতো বিশুদ্ধ হয় না। এ তেলে নারকেলর ঘ্রাণ অবশিষ্ট থাকে না। পুষ্টি ও ভিটামিনও অনেক কম থাকে। যারা নারকেল তেল দিয়ে খাবার রান্না করেন। সাধারণত এ তেল তারা ব্যবহার করে থাকেন। কারণ, খাবারে নারকেলের ঘ্রাণ পেলে অনেকের জন্য সে খাবার খাওয়া কষ্টকর হয়। তাই শরীর সুস্থ রাখতে ঘ্রাণমুক্ত নারকেল তেল ব্যবহার করেন তারা।

নারকেল তেল ৭৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রেখে তৈরি করতে হয়। যা যুক্তরাষ্ট্রে করা হয়। এ তাপমাত্রায় রেখে এবং চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড দিয়ে যে নারকেল পরিশোধন করা হয়, সেটাই প্রকৃত নারকেল তেল। এগুলোর দাম অনেক বেশি হয়ে থাকে। এজন্য আমাদের দোকানগুলোতে এ নারকেল তেল খুব কমই পাওয়া যায়। আমরা সাধারণ দোকান থেকে যে নারকেল পাই সেগুলো ৭৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায়, ব্লিচ ও ডিওডোরাইজড দিয়ে পরিশোধন করা হয়। এসব তেলের দাম তুলনামূলক কম। চুলের যত্নে এবং শরীরের সুস্থতায় নারকেল তেল ব্যবহার করতে হলে, অবশ্যই ভার্জিন নারকেল তেল ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় তেমন উপকার মিলবে না।

প্রাকৃতিক নারকেল সাবান কি ভার্জিন নারকেল তেল দিয়ে তৈরি হয়?
খুব স্বাভাবিকভাবে এখন পাঠক প্রশ্ন করবেন, তাহলে প্রাকৃতিক নারকেল সাবান কি ভার্জিন নারকেল তেল দিয়ে তৈরি হয়? উত্তর হলো, হ্যাঁ। এজন্যই প্রাকৃতিক নারকেল সাবানের মূল্য বেশি হয়ে থাকে। সাবান ও কোম্পানি ভেদে প্রাকৃতিক নারকেল সাবানের মূল্য ৫০০-১০০০ টাকা বা এরচেয়েও বেশি হয়।
প্রাকৃতিক নারকেল তেলের সাবান কেন কম টেকসই?
অনেকে বলেন, প্রাকৃতিক নারকেল সাবান ব্যবহার করতে না করতেই তো শেষ হয়ে যায়। দামও বেশি। কীভাবে আমরা তা ব্যবহার করবো। সাধারণ সাবান কিনলে দুইমাস চলে যায়। অথচ এ সাবান একমাসও যায় না!

দেখুন, আপনি সাধারণ সাবান কম মূল্যে পাচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ সাবান ব্যবহার করার কারণে আপনার শরীর ও ত্বকের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। এজন্য আপনাকে চিকিৎসকের কাছে দৌঁড়াতে হয়। চিকিৎসককে ফি দিতে হয়। ঔষধের জন্য খরচ করতে হয়। গাড়িভাড়া হিসেবে খরচ হয় অনেক টাকা। সব হিসাব মেলালে দেখবেন, আপনার বহু টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। অন্যদিকে প্রাকৃতিক নারকেল সাবান মাসে দুটা কিনলে আপনার দুই হাজার টাকা হয়তো খরচ হবে। কিন্তু বেঁচে যাবে চিৎিসকের ফি, ঔষধের খরচ ও গাড়িভাড়া। ভালো থাকবে আপনার ত্বক ও শরীর। এবার নিশ্চয় বুঝে গেছেন যে, টেকসই না হলেও সুস্থতার জন্য প্রাকৃতিক নারকেল সাবান ব্যবহারের বিকল্প নেই। আর হ্যাঁ, প্রাকৃতিক জিনিস বেশি টেকসই হয় না। যা বেশি টেকসই হয় তা প্রাকৃতিক নয়।

প্রাকৃতিক নারকেল সাবান ব্যবহারের উপকারিতা:
নারকেলে লরিক অ্যাসিড থাকে। যা স্যাচুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড ও প্রদাহ হ্রাস করে। ত্বককে হাইড্রেটেড রেখে সুস্থ, মসৃণ ও কোমল রাখতে সাহায্য করে।নারকেল তেল কোলাজেনের উৎপাদন বাড়ায়। কোলাজেন বলিরেখা দূর করে।যাদের ত্বকে অ্যাকজিমা ও সোরিয়াসিস আছে তাদের জন্য নারকেল তেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। কারণ, নারকেল তেল ত্বককে ঠান্ডা রাখে।নারকেল তেল ব্যবহারে চেহারা পরিষ্কার থাকে। চেহারায় ব্রণ হয় না।প্রাকৃতিক নারকেল সাবান যেহেতু নারকেল তেল দিয়েই তৈরি। আপনি যখন এ সাবান ব্যবহার করবেন। উল্লেখিত সব উপকারের মাধ্যমে আপনি উপকৃত হবেন।
কেন ত্বকের যত্নে নারকেল তেল ব্যবহার করা হয়?
নারকেল তেল মূলত ময়েশ্চারাইজার, ক্লিনজার এবং এক্সফোলিয়েন্টের কাজ করে। যদি কখনও দেখেন যে ত্বক শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে, আপনি নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন। ত্বকের মৃত কোষ দূর করতেও সাহায্য করে নারকেল তেল ।
যেভাবে ব্যবহার করবেন:
- গোসল করার সময় পানিতে সামান্য নারকেল তেল মিশিয়ে গোসল করতে পারেন ২. গোসল সেরে লোশন ব্যবহার না করে নারকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন।
- গোসলের মাঝে কয়েক মিনিট নারকেল তেল শরীরে ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন।
- গোসলের আগে নারকেল তেল শরীরে ম্যাসাজ করে, উষ্ণ তোয়ালে দিয়ে মুছে ফেলুন। এরপর গোসল সেরে নিন।
নারকেল তেল শুধু তেল নয়। এটা এক প্রকার ঔষধও বটে। যে কোনো ত্বকের জন্য নারকেল উপকারী। নারী-পুরুষ ও শিশু সবার ত্বকের যত্নে নারকেল তেলের বিকল্প নেই।

অনেকে বলেন, এত সময় কোথায় ভাই? খাওয়ার সময় পাই না, আবার ত্বকের যত্ন! যাদের সময় নেই কিংবা যাদের অলসতা স্বভাব আছে; এসব বিবেচনা করেই আবিষ্কার করা হয়েছে নারকেল তেল দিয়ে প্রাকৃতিক সাবান। সময় থাক আর না থাক এবং অলসতা যতই কাজ করুক; গোসল সবাইকে করতে হয়। গোসলের সময় নারকেল তেলের প্রাকৃতিক সাবান ব্যবহার করলে; সময় ব্যয় করে আর নারকেল তেল ব্যবহার করতে হবে না। এমনকি মাথায় ভালো করে সাবান ব্যবহার করে গোসল করলে, চুলের যত্নে নারকেল তেলও দিতে হবে না।
নিজেই তৈরি করতে চান নারকেল তেলের সাবান?
পাঠক বলতে পারেন যে, নিজেই নারকেল তেলের সাবান বানাবো এবং নিজেই ব্যবহার করবো। কোনো সমস্যা নেই। বলে দিচ্ছি, কীভাবে আপনি বানাতে পারবেন নারকেল তেলের সাবান।
- এক কাপ নারকেল তেল
- এক কাপ বিশুদ্ধ পানি
- আধা কাপ লাই

নারকেল তেল ও বিশুদ্ধ পানি একটা পাত্রে নিন। হালকা আঁচে নারকেল তেল গলে যাওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন। এরপর তা ঠান্ডা স্থানে নিয়ে তাতে লাই দিয়ে ভালোভাবে নাড়তে থাকুন। ছাঁচে ঢালুন এবং ঠান্ডা স্থানে ২৪ ঘন্টা রেখে দিন।সাবান তৈরি হয়ে গেলে তা ব্যবহার করুন। ত্বক ও শরীর সুস্থ রাখুন।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি- ফ্রিপিক