“ তোমার চোখগুলো খুব সুন্দর আপু”
সিমরানের এ কথা শুনে মালিহা ভেংচি কেটে বলল-“মোটেও না। আমার চোখগুলো ছোট ছোট। আমার ভালো লাগে না। মালিহার মত অনেকে আছেন যারা নিজের প্রশংসা নিতে পারেন না। আত্মসম্মান হল নিজের সম্পর্কে নিজের ধারণা,মতামত বা দর্শন। অন্যভাবে বলতে পারি,আমরা যখন নিজে যেমন তেমনভাবেই নিজেকে গ্রহণ করি, সন্তুষ্ট থাকি ও নিজের দোষ -ত্রুটি মেনে নিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করি তখন তা হয় আত্মসম্মান।

আত্মসম্মান এর অভাবে কিছু নারী নিজের অজান্তে নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যেমন ক্ষতি করছেন তেমনি পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও খুব নেতিবাচক প্রভাব ফেলছেন। আবার অতিরিক্ত আত্মসম্মানবোধও ভালো নয়। কেননা এতে করে যে কোন নারী অন্যকে সবসময় খাটো ভাবে, অহংকারী হয়ে ওঠে। একজন সুস্থ আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন নারী নিজের গুণগুলো মেলে ধরে দোষগুলো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করে। এতে সে নিজে ভালো থেকে অন্যকে ভালো রাখে। বর্তমান সময়ে একজন নারী বিভিন্নভাবে তার আত্মসম্মান বৃদ্ধি করতে পারে। আজকের ব্লগে আমরা নারীদের আত্মসম্মান বৃদ্ধির এ উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করবো।চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক –

নিঁখুত স্বভাব এড়িয়ে চলুন
মনে রাখবেন,মানুষ মাত্রই ভুল। আপনি যদি একজন শক্তিশালী নারী হতে চান তবে সব কাজে সবসময় শতভাগ সফল হবেন এ ধারণা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। আপনি মানুষ ,কিছু ভুল হতেই পারে। এটা মেনে নিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়াতে নতুন নতুন কাজ শুরু করুন। এতে করে কিছু হলেও শিখতে পারবেন,আত্মবিশ্বাসও বাড়বে।

নিজের সম্পর্কে প্রতিদিন ভালো কিছু লিখুন
সারাদিন আমরা নারীরা কত কাজ করে থাকি। কিন্তু এর জন্যে একটু সময় নিয়ে নিজের প্রশংসা করা হয় কি? হয়তো হয় না। এটা ঠিক নয়। নিজের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করতে অন্যের আশায় বসে না থেকে প্রতিদিন নিজের যে কোনো ভালো কাজের জন্য প্রশংসাসূচক কিছু লিখে ফেলুন।ধরুন আজ খুব ভালো সবজি রান্না করেছেন এ সম্পর্কে নিজের প্রশংসাসূচক দু’লাইন লিখে ফেলুন। আবার মনে করুন সংসারের ব্যয় কমিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছেন,অফিসে কোনো কাজ এ দক্ষতা বাড়িয়েছেন এগুলো ও লিখতে পারেন।

‘না’ বলতে শিখুন
আমরা নারীরা বেশিরভাগ সময় নিজের চেয়ে অন্যের সুখের কথা ভাবি।ধরুন আপনি অসুস্থ কিন্তু আপনার কোনো আত্মীয় বাসায় বেড়াতে আসতে চাইল। আপনি লজ্জায় না বলতে পারলেন না। ভাবলেন অসুস্থ হয়েও আপ্যায়ন করবেন। এটা উচিত নয়। কারণ এতে মানসিক ও শারীরিক উভয় স্বাস্থ্যেরই ক্ষতি হয়। নিজে সুস্থ থাকলে অন্যকে সেবা করা যায়। তাই সব পরিস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’ বলার অভ্যাস পরিত্যাগ করে নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা ভেবে প্রয়োজনে ‘না’ বলতে শিখুন।

অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকুন
সমস্যা ছাড়া জীবন সম্ভব নয়।প্রতিটি মানুষের জীবনে কিছু না কিছু সমস্যা থাকবেই।আপনি যদি একজন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী হতে চান তবে যে কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সমস্যা না খু্ঁজে সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।অভিযোগ ছেড়ে উদ্দ্যমী হোন,পরিশ্রম করুন।এতে করে নিজের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়বে,আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।

নিজেকে জানুন
সৃষ্টিকর্তা প্রতিটি মানুষকে কিছু না কিছু গুণ দিয়েছেন। এ গুণ খুঁজে বের করতে হলে নিজের প্রতি মনোযোগী হতে হবে।নারীদের উচিত দিনের কিছু সময় হলেও একাকী সময় ব্যয় করা।এ সময়ে চিন্তা করুন আপনি কোন কাজ এ ভালো,কোন কাজ এ আপনার আগ্রহ রয়েছে, এমন কি গুণ আছে যা দিয়ে মানুষের উপকার করা যায়। এভাবে নিজেকে যাচাইয়ের মাধ্যমে নিজের সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানতে পারবেন,গুণকে বিকশিত করে নিজের ও অন্যের উপকার করতে পারবেন।

নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা এড়িয়ে চলুন
প্রত্যেক মানুষ আলাদা। সবার চাহিদা,বৈশিষ্ট্য এক রকম নয়। ধরুন সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের হানিমুনের ছবি,চাকুরীর প্রমোশন এসব দেখে আপনি নিজেকে অসুখী ভাবেন।কারণ আপনার জীবনে এসব নেই ।কিন্তু আপনি হয়তো জানেন এসবের পেছনে ও তাদের জীবনে আপনার মত কিছু না কিছু অপ্রাপ্তি রয়েছে যেগুলো শেয়ার করা হয় না।তাই অন্যের জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করবেন না, নিজের প্রাপ্তিগুলোর কথা ভাবুন। আত্মতৃপ্তি ও আত্মসম্মান দুটোই বাড়বে।

পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও পরিমিত পানি পান করুন
একটু ভেবে দেখুন তো আপনি অপুষ্টিতে ভুগছেন, শরীরে নানা রোগ-ব্যাধি দেখা দিচ্ছে তবে আপনার কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই খারাপ লাগবে। নিজেকে সুস্থ রাখতে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস পরিহার করুন,তাজা শাকসবজি ও ফলমূল গ্রহণ করুন। পাশাপাশি প্রতিদিন অবশ্যই ২ লিটার পানি ও ডিটক্স ড্রিংকস,জুস পান করুন। এতে করে আপনি সতেজ থাকবেন,কর্মঠ হবেন।

রুপচর্চা করুন
সুস্হ ত্বকই সুন্দর ত্বক। আপনি যে বর্ণেরই হোন না কেন তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকুন। ত্বক সতেজ রাখতে নিয়মিত ক্লিনজিং, টোনিং ও ময়েশ্চারাইজ করুন। চুলের যত্ন নিন। সপ্তাহে একদিন যে কোন হেয়ারমাস্ক ব্যবহার করুন। মাসে একবার ফেসিয়াল, হেয়ার স্পা এগুলো ও করতে পারেন। দেখবেন নিজেকে পরিপাটি রাখার মাধ্যমে আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে।

অতীতকে অগ্রাহ্য করুন
অতীত সবারই থাকে। আপনি যদি নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তুলতে চান, তবে অতীতের ভুল-ত্রুটি দিয়ে নিজেকে বিচার করলে হবে না।পূর্বের দোষ নিয়ে সারাক্ষণ নিজেকে কটাক্ষ না করে ক্ষমা করে দিতে শিখুন। বর্তমান সময়ে আপনার অবস্থা কেমন, কি কি ইতিবাচক দিক রয়েছে এগুলো বের করে নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা করতে হবে। উপভোগ করতে হবে, কাজে লাগাতে হবে।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হোন
অর্থের প্রয়োজন সবারই আছে। এ অর্থের জন্য অন্যের উপর নির্ভরশীল না হয়ে উপার্জন এর চেষ্টা করুন। হতে পারে আপনি অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিত তাতে কি? শিক্ষা ছাড়া আরও এমন অনেক গুণ রয়েছে যা দিয়ে আপনি স্বাবলম্বী হতে পারেন। যেমন- চাইলে রান্নার পেজ খুলে আয় করতে পারেন,সেলাই করে আয় করতে পারেন। এগুলো করে নিজে যেমন আয় করতে পারবেন তেমনি অন্যকে সহযোগিতাও করতে পারবেন।

নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন
শরীরচর্চা কম বেশি সবাই করে থাকে কিন্তু সুস্থ থাকতে মানসিক যত্নেরও প্রয়োজন।নারীরা দেখা যায় ঘরের কাজে বেশিরভাগ সময় ব্যয় করে বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম।কিন্তু নিজের যত্নে নারীকে একটু সময় নিয়ে বান্ধবী, আত্মীয়দের সাথে একটু বেড়াতে যেতে হবে, শপিং করতে হবে,নিজের পছন্দের কোনো রেষ্টুরেন্টে যেতে হবে। এছাড়াও মনকে ভালো রাখতে ইয়োগা করতে হবে,গাছ লাগাতে হবে,বই পড়ার মত অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

অন্যকে ছোট করা পরিহার করুন
ধরুন কেউ একজন আপনার নাক বোঁচা, আপনি বেঁটে, আপনার পোশাক, দেহের গড়ন কেমন এসব নিয়ে মন্তব্য করল। তার সম্পর্কে আপনার মতামত নিশ্চয়ই খারাপ হবে। তাই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন নারী হতে অন্যকে উপহাস করা বন্ধ করুন, প্রশংসা করুন, সহযোগিতা করুন, হিংসা এড়িয়ে চলুন। দেখবেন ভেতর থেকে নিজের প্রতি সম্মান বেড়ে যাবে,মানসিক শান্তিও আসবে।

টক্সিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকুন
টক্সিক যে কোন সম্পর্কই খারাপ। হতে পারে আপনার কোনো বন্ধু,সহযোগী, স্বামী টক্সিক।এক্ষেত্রে আপনার উচিত লোকলজ্জার ভয়ে এসব সম্পর্ক টিকিয়ে না রেখে সম্পর্ককে স্বাস্থ্যকর করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া। আর তাতেও কাজ না হলে রিলেশন ভেংগে দেয়া।কারণ তা না হলে আপনি শারীরিক,মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।

লোকের কথায় কান না দেয়া
আপনার হয়তো খুব ইচ্ছা ফ্রিল্যান্সিং শেখার। কিন্তু লোকে বলল যে এসব শিখে কোনো লাভ নেই, এগুলোর মূল্য নেই। ফলে নিজের শেখার ইচ্ছা পরিত্যাগ করলেন। এরকম পাছে লোকে কিছু বলে এ চিন্তায় থাকলে আপনি কখনোই কিছু শিখতে পারবেন না, জানতে পারবেন না। আত্মউন্নয়নের জন্য নিজের মন ও চিন্তা-চেতনাকে বিশ্বাস করতে হবে। এতে আত্মমর্যাদাবোধ তৈরি হবে।
পাঠক একজন নারী মানসিকভাবে পুরুষের চেয়েও শক্তিশালী। তাই হতাশ হবেন না,সাহসী হোন, নিজেকে সম্মান করুন। নিজেকে শ্রদ্ধার মাধ্যমে বিশ্বকে আপনিই শিখিয়ে দিন কিভাবে আপনাকে সম্মান করতে হবে। তবেই আপনাকে দেখে শত শত নারী অনুপ্রাণিত হবে,সমাজ আলোকিত হবে।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি- ফ্রিপিক
https://www.createwritenow.com/journal-writing-blog/10-ways-to-help-a-woman-with-low-self-esteem?hs_amp=true
https://www.betterup.com/blog/how-to-improve-self-esteem?hs_amp=true
https://www.nhs.uk/mental-health/self-help/tips-and-support/raise-low-self-esteem/
https://www.womenshealthmag.com/uk/health/mental-health/a32129899/self-esteem/
পাঠকরা যা বলছেন

"আমি শুধু বলতে চাই আপনার নিবন্ধগুলির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! আমার প্রবলেম ছিল, এখানে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সাহায্য করেছে। আপনি আমাকে আশা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।"

"আমাদের মেইলিং তালিকায় সদস্যতা নিতে পৃষ্ঠার নীচে আপনার ইমেল ঠিকানা লিখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বশেষ বিষয়বস্তু, নতুন পণ্য এবং লেটেষ্ট ব্লগ এর নোটিফিকেশন দ্রুত পেতে পারেন ।"
লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?