আমরা সবাই সুখী হতে চাই কিন্তু কিভাবে সুখে থাকতে হয় তা অনেকেই জানিনা।সুখে থাকতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে আসলে সুখ জিনিস টা কি? সুখ হচ্ছে এক অনুভূতি যা প্রাপ্তি, ভালোবাসা, আনন্দ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তবে এক এক জনের কাছে সুখের সংজ্ঞা এক এক রকম। ধরুন, কেউ দুই বেলা একমুঠো খেতে পারলে খুশি আবার কেউ দু’বেলা হরেক রকমের খাবার খেয়ে ও অতৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। তাহলে,বুঝা যাচ্ছে সুখ মানুষের চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপরও নির্ভর করে।

সুখ এমন আরও অনেক বিষয় দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলেও, নিজের মধ্যে সুখের উৎস তৈরী করতে পারি তবেই প্রকৃত অর্থে সুখী হওয়া যায়। একটু চিন্তা করলেই দেখবেন সুখে বা আনন্দে থাকার অনেক উপায় আমাদের নিজের মধ্যে সুপ্ত রয়েছে। এ উপায়গুলো জাগিয়ে তুলে নিজে কিভাবে আনন্দিত থাকা যায় তা জানতে হবে। কারণ নিজে প্রসন্ন থাকলেই অন্যকে সুখী রাখা যায়। আসুন তাহলে নিজেকে সুখী রাখার উপায়গুলো জেনে নেয়া যাক ।

হাসতে শিখুন
হাসি আমাদের আমাদের ব্রেইন এ ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়।ডোপামিন হল এমন এক হরমোন যা আমাদের আনন্দিত,আশাবাদী,প্রফুল্ল রাখে।তাই শুধু খুশি হলেই হাসতে হবে এমনটা নয়,বরং নিজেকে খুশি রাখতে মাঝে মাঝে মুচকি হাসুন।

কৃতজ্ঞ হোন
প্রতিদিন আমরা কত কাজ করছি। সব কাজের প্রাপ্তি -অপ্রাপ্তি দুটোই রয়েছে। না পাওয়াকে ঝেড়ে ফেলে আপনার ছোট ছোট সকল প্রাপ্তিগুলো গণনা করুন ও অন্তর থেকে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। দেখবেন নিজেকে অনেকটাই পরিপূর্ণ মনে হবে।

নিজের প্রশংসা করুন
সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেক মানুষকে কিছু না কিছু গুণ দিয়েছেন। কেউ রান্নায় ভাল,কেউ পড়াশোনায় ভালো,কেউ বা ছবি আঁকায় ভালো। একটু ভেবে দেখুন তো আপনার কি কি গুণ রয়েছে ? যত ক্ষুদ্রই মনে হোক না কেন, সকল গুণের জন্য নিজের প্রশংসা করুন। এতে করে আত্মতুষ্টি অর্জন হয়।

নিজেকে ক্ষমা করুন
ক্ষমা মহৎ গুণ। এ গুণের চর্চা কেবল অন্যের নয় নিজের জন্য ও করতে হবে।অতীতে কোনো ভুল হয়ে থাকলে সেগুলোর জন্য সারাক্ষণ নিজেকে দোষারোপ করবেন না।আফসোস না করে ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেকে ক্ষমা করুন,নিজেকে আশ্বাস দিন,আশাবাদী হোন।

কান্না করুন
সুখ-দুঃখ আমাদের জীবনের অংশ।সুখে যেমন মন খুলে হাসতে হবে,দুঃখে ও তেমনি মনের আবেগ প্রকাশ করতে হবে।কিন্তু অনেকে ই আছেন যারা কান্না চেপে রাখেন।এটা ঠিক নয়।এভাবে দুঃখের অনুভূতিগুলো নিজের মধ্যে পুষে রাখলে মানুষ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায় ।কষ্ট হলে কান্না করুন,চোখের জলের মাধ্যমে কস্টের অনুভূতিগুলো বের করে দিন।দেখবেন অনেকটা হালকা লাগছে।
নিজেকে পুরস্কৃত করুন
পুরস্কার পেতে কার না ভালো লাগে? এটি আমাদের আনন্দ দেয়,উৎসাহিত করে। গিফট পেতে হলে খুব বড় কিছু অর্জন করতে হবে এমনটা না,ছোট কোনো ভালো কাজের জন্য ও উপহার দেয়া যায়। অন্য কারও আশায় বসে না থেকে যে কোনো অর্জনের জন্য মাঝে মাঝে নিজেকে খুব ছোট কিছু হলেও উপহার দিন।

প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটান
বর্তমান দ্রুতগতির জীবনে হয়তো খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।কিন্তু এ ব্যস্ততার মাঝে ও প্রিয় মানুষদের জন্য একটু সময় বের করে নিন।তাদেরকে দাওয়াত দিন,নিমন্ত্রণ গ্রহণ করুন,দেখা-সাক্ষাত সম্ভব না হলেও অন্ততপক্ষে কল দিয়ে খোঁজ খবর নিন,সুখের কোনো সংবাদ শেয়ার করুন। এতে করে আপনার আনন্দ ভাগ হয়ে আরও বেড়ে যাবে।

ব্যয়াম করুন
শরীরচর্চা করে শুধু শারীরিক উন্নতি হয় না সেই সাথে মানসিক শক্তি ও বৃদ্ধি পায়।ইয়োগা,যেমন-কপালভাতি,প্রাণায়াম আমাদের মানসিক স্বস্তি দেয়।এছাড়া বিভিন্ন খেলাধুলা, যেমন-কানামাছি,দৌড়াদৌড়ি মনকে প্রফুল্ল রাখতে সহায়তা করে।নিজেকে খুশি রাখতে তাই নিয়মিত হাঁটুন,ইয়োগা করুন চাইলে কোনো স্পোর্টস ক্লাবে ও জয়েন করতে পারেন।

মনের কথাগুলো লিখে ফেলুন
প্রতিদিন অহরহ ঘটনা ঘটে থাকে। এগুলোর মধ্যে কিছু ঘটনা আছে যা হয়তো আপনাকে কস্ট দিচ্ছে। এসব ঘটনাগুলো লিখে ফেলুন। নিজের মনের রাগ,ক্ষোভ লিখে শেষ করে ফেলুন। সাথে সাথে আজকের দিনে কি কি ভালো জিনিস হয়েছে তাও হাইলাইট করে লিখতে পারেন। এতে মন ভালো থাকে।সবচেয়ে ভালো হবে যদি ঘুমের আগে লিখতে বসেন।তাহলে আর কোনো চিন্তা নিয়ে আপনাকে ঘুমাতে যেতে হবে না।

নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করুন
ওর তো চাকরি হয়ে গেল,ও তো স্কলারশিপ পেয়ে গেল কিন্তু আমি তো বেকার,পড়ালেখায়ও খারাপ এসব চিন্তা করা যাবে না।এগুলো মানসিক শান্তি নস্ট করে।সুখী থাকতে হলে নিজেকে নিজের সাথে তুলনা করতে হবে।গতকালের ‘আমি’ এর তুলনায় আজকের ‘আমি’ কতটা ভালো এটা ভেবে কাজ করতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে।

ইতিবাচক চিন্তা করতে হবে
জগত পরিবর্তনশীল।আজকে আপনি সাফল্যের শীর্ষে রয়েছেন কাল ব্যর্থতায় ডুবে যেতে পারেন।এজন্য হতাশ না হয়ে ভাবুন বর্তমানে কি কি সম্ভাবনা রয়েছে,আপনি কি কি নতুন শিখতে পেরেছেন।সকল পরিস্থিতিতে এরকম নেতিবাচকতা দূরে ঠেলে দিয়ে ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে পারলে সুখ হাতের মুঠোয় এসে ধরা দিবে।

সূর্যস্নান করুন
আপনি কি জানেন সূর্যেরআলো আমাদের মনকে প্রভাবিত করে। দিনের আলোয় মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নিঃসরণের পরিমাণ বেড়ে যায় যা মনকে ভালো রাখতে সাহায্য করে। আরও রয়েছে ভিটামিন ডি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে শরীর সুস্থ থাকে। এজন্য সুখী ও সুস্থ শরীর,মন পেতে প্রতিদিন ১০ মিনিট সূর্যের আলোতে থাকুন।

পর্যাপ্ত ঘুমাতে হবে
ঠিকমত ঘুম না হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, হজমে সমস্যা হয়। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দৈনিক ৭-৮ ঘন্টা ঘুমের প্রয়োজন।গভীর ঘুম এর জন্যে ঘুমানোর দুই থেকে তিন ঘন্টা আগে খাবার গ্রহণ করুন,হালকা সহজপাচ্য ডায়েট নিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল মনের মধ্যে কোনো রাগ পুষে না রেখে সবাইকে ক্ষমা করে ঘুমাতে যান।

বর্তমানে বাঁচতে শিখুন
অতীত চলে গিয়েছে, ভবিষ্যত এখনও আসেনি। অতীতের বাজে স্মৃতিগুলোর কথা মাথায় গেঁথে রাখবেন না। ভবিষ্যতে কি হবে তা আমরা জানি না তা এটা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করলে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে বরং সুখী হতে চাইলে বর্তমানের নিয়ামতের কথা চিন্তা করুন,সেগুলোকে নিয়ে আশাবাদী হোন,আজকের সর্বোচ্চ সার্মথ্য অনুযায়ী কাজ করুন।এতে ই শান্তি আসবে।

নিজের যত্ন নিন
শরীরের সাথে মনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শরীর সুস্থ থাকলে মন ভালো থাকে।নিজেকে সুখী রাখতে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন, পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করুন। ত্বকের যত্ন নিন,চুলের যত্ন নিন।নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন,পরিপাটি রাখুন।

ভ্রমণ করুন
মন ভালো রাখতে চাইলে মাঝে মাঝে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতে হবে। তাহলে অন্যের জীবনাচরণ সম্পর্কে জানতে পারবেন, নতুন নতুন বিষয় শিখতে পারবেন, জীবনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে।

অপরের সেবা করুন
অন্যের সেবা করার মাধ্যমে নিজের মধ্যে ও একটা ভালোলাগা তৈরি হয়, নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।সুখী থাকতে তাই অন্যের দুঃখ -কষ্টে এগিয়ে যান,সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করুন।

ইতিবাচক মানুষের সাথে বেশি সময় ব্যয় করুন
যারা সবকিছুতে সমস্যা দেখে,অন্যকে হিংসা করে,অপরের নিন্দা করে তাদের সাথে থাকলে আপনি ও ধীরে ধীরে এসবে অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন।নিজেকে ভালো রাখতে উদ্দ্যমী,আশাবাদী,সহানুভূতিশীল মানুষের সাথে মিশতে হবে।

পাঠক আজকের আলোচনা এখানেই শেষ করছি।আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন যে নিজের সুখের চাবিকাঠি আমাদের নিজের হাতে ই রয়েছে।আপন কুয়ায় পানি থাকলে তবে ই না অন্য কেউ জল নিতে পারবে।তাই নিজে ই সুখী মানুষ হোন,যাতে অন্য কেউ এ সুখের ভাগীদার হতে পারে । সবশেষে একটি কথায় মাথায় গেঁথে রাখুন যে সুখে থাকা মানে দুঃখবিহীন জীবন নয়,বরং শত প্রতিকূলতার মধ্যে ও আশা নিয়ে বেঁচে থাকা, সকল পরিস্থিতিতে সন্তুষ্ট থাকা।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি- ফ্রিপিক
https://www.healthline.com/health/how-to-be-happy
https://blog.gratefulness.me/how-to-make-yourself-happy/amp/
https://www.wikihow.com/Make-Yourself-Happy?amp=1
https://www.lifehack.org/885684/how-to-make-yourself-happy
পাঠকরা যা বলছেন

"আমি শুধু বলতে চাই আপনার নিবন্ধগুলির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! আমার প্রবলেম ছিল, এখানে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সাহায্য করেছে। আপনি আমাকে আশা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।"

"আমাদের মেইলিং তালিকায় সদস্যতা নিতে পৃষ্ঠার নীচে আপনার ইমেল ঠিকানা লিখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বশেষ বিষয়বস্তু, নতুন পণ্য এবং লেটেষ্ট ব্লগ এর নোটিফিকেশন দ্রুত পেতে পারেন ।"
লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?