স্বাস্থ্যকর চুলের রহস্য – প্রাকৃতিক উপাদানে চুলের যত্ন। আধুনিক রূপচর্চার অন্যতম বিষয় হল চুলের সৌন্দর্য্য। এটি এমন এক গহনা যা, আমাদের ব্যাক্তিত্ব ও সামগ্রীক সৌন্দর্য্যকে ফুটিয়ে তুলতে প্রভাবিত করে। চুল ও ত্বক এর মাধ্যমেই প্রকাশ পায় সুস্থতা । শরীরে রোগ-ব্যাধি, দুশ্চিন্তাগ্রস্ততা চুলের ক্ষতীসাধন করে এর ফলে অকালপক্বতা ও লাবণ্যহীনতা দেখ দেয়। ধুলা-বালি, দূষণ, ক্যামিকেলযুক্ত পণ্যের অবাধ ব্যাবহার এর ফলে স্বাস্থ্যকর চুল পাওয়া অনেকটাই কষ্টসাধ্য। শত ব্যাস্ততার মাঝেও একটু সময় নিয়ে নিষ্প্রাণ চুলের সঠিক পরিচর্যা করতে পারলে, চুলের স্বাস্থ্য ও প্রাণবন্ততা ফিরে পাওয়া সম্ভব। চুলের সঠিক পরিচর্যার উপায়টা জানতে হবে। আমরা এখানে এমন কয়েকটি টিপস সম্পর্কে জানব, যা চুলকে স্বাস্থ্যকর করে তুলবে।
Table of Contents
Toggleপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
সুন্দর, ঘন,সফট চুল পেতে হলে আপনাকে অবশ্যই পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। ডিম, দুধ, টাটকা শাকসবজি, ফলমূল খাওয়ার পাশাপাশি ভিটামিন-ই ও ভিটামিন- সি জাতীয় খাবার খাদ্য তালিকায় রাখুন। তবে চুল পড়া কমবে ,অকালপক্বতা দূর হবে।
ডিম ও দই এর মাস্ক
যাদের চুল পড়ে যাচ্ছে তাদের জন্য ডিম ও দই এর মাস্ক ব্যবহার খুবই কার্যকরী।১ টা ডিম এর সাথে ২ চামচ টকদই মিশিয়ে চুলে লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিট। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

লেবুর রস ও পুদিনাপাতা গুড়া
লেবুর রস খুশকির জন্য দারুণ কাজ করে । চুলের খুশকি হলে ২ চামচ লেবুর রস এর সাথে ১ চামচ পুদিনাপাতার গুড়া,১ চামচ হরিতকি গুড়া মিশিয়ে ১৫-২০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন। এতে খুশকি দূর হওয়ার পাশাপাশি স্ক্যাল্প ও পরিষ্কার থাকবে।
রিঠা
রিঠা চুলকে সফট, সিল্কি করে। অল্প পরিমাণে রিঠা নিয়ে সারারাত ভিজিয়ে রাখুন।পরদিন চুল অর্গানিক ও ন্যাচারাল শ্যাম্পু দিয়ে ওয়াস করে এ পানি ছেঁকে নিয়ে পরে ব্যবহার করুন। ভালো ফল পাবেন।
অলিভ অয়েল, লবণ ও লেবুর রস
মুখের ত্বক এর মতো আমাদের স্ক্যাল্পে ও মৃত কোষ থাকে। এগুলো দূর করতে সপ্তাহে ২ বার এক চামচ অলিভ অয়েল, পিংক সল্ট ও লেবুর রস মিশিয়ে স্ক্যাল্পে ১০ মিনিট ম্যাসাজ করুন।চুল মজবুত, প্রাণবন্ত হবে।

মাথার ত্বক ম্যাসেজ
নিয়মিত মাথার তালু ম্যাসেজ করলে রক্ত চলাচল বাড়ে।ফলে চুল ত্বক থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে আরো উজ্জ্বল, সতেজ হয়ে উঠে এবং চুলের গড় আয়ু বেড়ে যায়।ম্যাসেজ করার কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই।আপনার সুবিধা অনুযায়ী সপ্তাহে ৪-৫ দিন যে কোনো সময় ৫-১০ মিনিট ম্যাসাজ করতে পারেন।
ভেজা চুল আঁচড়ানো বন্ধ করা
শুকনো চুলের তুলনায় ভেজা চুল অনেকটাই দুর্বল হয়,ফলে ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।তাই কখনোই ভেজা চুল আঁচড়াতে যাবেন না । চুল শুকালে ধীরে ধীরে গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত আঁচড়ে নিবেন।

অত্যধিক সময় রোদ এ না থাকা
বেশিক্ষণ সময় নিয়ে রোদ এ থাকলে সূর্যের আলট্রাভায়োলেট রশ্মি মাথার ত্বকের স্বাভাবিক তেল শুষে নেয়। ফলে চুল শুষ্ক, নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে।তাই স্বাস্থ্যকর চুলের জন্য রৌদ্রের প্রখর তাপ থেকে বাঁচতে ছাতা ব্যবহার করুন।
নিয়মিত শ্যাম্পু করা
অনেকে প্রতিদিন শ্যাম্পু ব্যবহার করে থাকেন।কিন্তু এতে স্ক্যাল্পের ময়েশ্চার কমে গিয়ে চুল রুক্ষ, মলিন হয়ে যায়। সুন্দর,মজবুত চুল পেতে তাই সপ্তাহে ২-৩ বার এর বেশি শ্যাম্পু করা থেকে বিরত থাকুন।আর কেনার সময় ক্যামিকেল এর পরিবর্তে অবশ্যই অর্গানিক ও প্রাকৃতিক বা নরম শ্যাম্পু বেছে নিবেন।

নিয়মিত তেল ব্যবহার করা
নারিকেল তেল, অলিভ অয়েল বা আমন্ড অয়েল আপনার পছন্দ অনুযায়ী, চুলের ধরন অনুযায়ী যে কোন তেল সপ্তাহে ৩ দিন ব্যবহার করতে পারেন।কারণ তেল চুলের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে,চুলে পুষ্টি জোগায়। সম্ভব হলে অয়েল ম্যাসাজের আগে হালকা গরম করে নিন।
সঠিক নিয়মে কন্ডিশনার ব্যবহার
অনেকেই আছেন যারা পুরো চুলে কন্ডিশনার ব্যবহার করে থাকেন ।এতে করে চুলের গোড়া নরম হয়ে যায়,ফলে চুল পড়ে।তাই চুল পড়া রোধে কন্ডিশনার চুলের মাঝ বরাবর থেকে নিচ পর্যন্ত ব্যবহার করুন।

প্রাকৃতিক উপায়ে চুল শুকাতে হবে
অনেকে চুল শুকাতে হেয়ারড্রাইয়ার ব্যবহার করেন।এতে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে।চাইলে আপনি রোদে কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে বা সারা পিঠে কেশ ছড়িয়ে দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে দ্রুত চুল শুকাতে পারেন।
অত্যধিক গরম পানি ব্যবহার না করা
চুল ধোওয়ার সময় খুব বেশি গরম পানি ব্যবহার করবেন না। এতে চুল শুষ্ক হয়ে চুলকানির সৃষ্টি হতে পারে। ঠান্ডা পানি বা হালকা কুসুম গরম পানি ব্যবহার করে চুল ধুয়ে নিবেন।
হিট স্টাইলিং এড়িয়ে চলা
চুলকে নিত্য নতুন ভাবে সাজাতে হয়তো কখনো কার্ল করছেন আবার স্ট্রেইট করছেন।এগুলোর তাপে চুল ভেঙ্গে যাওয়া,আগা ফাঁটা ইত্যাদির কারণ । চুল পড়া এড়াতে তাই হিট স্টাইলিং এড়িয়ে চলুন। একান্তই প্রয়োজন হলে ব্যবহারের আগে হিট প্রোটেকটর স্প্রে বা কেমিক্যালবিহীন সিরাম লাগিয়ে নিন।
দুশ্চিন্তা পরিহার করা
নিরাশ থাকলে, দুশ্চিন্তা করলে চুল পড়া বেড়ে যায়,অকালে চুল পেঁকে যায়। স্বাস্থ্যকর চুল পেতে হলে সবসময় ইতিবাচক চিন্তা করুন, হাসিখুশি, প্রফুল্ল থাকুন,কৃতজ্ঞ হোন।
চিরুনি পরিষ্কার করা
শুধু কি মাথায় শ্যাম্পু করলেই হবে? যে চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে থাকেন তাও পরিষ্কার রাখতে হবে। তাহলে চিরুনির লেগে থাকা ময়লা আর স্ক্যাল্পে যাবে না ।চিরুনি ধোওয়ার জন্য সবসময় গরম পানি ও সাবান ব্যবহার করুন।
চুলের ডগা ছেঁটে নেয়া
আপনি যদি চুলের যত্ন নিতে অবহেলা করেন, টেনেহিঁচড়ে চুল আঁচড়ান তবে চুলের ডগা ফেঁটে যেতে পারে। একবার ডগা ফাঁটলে সে চুল গোড়া পর্যন্ত চিরে যেতে পারে। তাই তিনমাস অন্তর চুলের ডগা ছেঁটে নিন। এতে চেরা ডগার শ্রীহীন ভাব থেকে মুক্তি পাবেন।
পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় গ্রহণ
পুষ্টিকর খাবার এর পাশাপাশি চুলের যত্নে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানীয় পান করতে হবে,নয়তো স্ক্যাল্পে ডিহাইড্রেশন হতে পারে। এজন্য দৈনিক ২-৩ লিটার পানি পান করুন। ।পাশাপাশি ডাবের পানি,ফলের জুস,ডিটক্স ড্রিংক্সও খেতে হবে।
সঠিক চিরুনি ব্যবহার
চুলে জট থাকলে সহজে ছিঁড়ে যেতে পারে। তাই চিরুনি ব্যবহারের আগে অবশ্যই আঙ্গুল দিয়ে জট ছাড়িয়ে নিবেন। সরু দাঁতের চিরুনি ব্যবহারে চুল বেশি পড়ে, এজন্য মোটা দাঁত এর চিরুনি ব্যবহার করুন।
প্রাকৃতিক রং ব্যবহার
কাঁচা বা পাঁকা চুল রং করতে বাজারের ক্ষতিকারক ক্যামিকেল এর পরিবর্তে আপনি নিজেই ঘরে একচামচ কফি পাউডার,দুই চামচ মেহেদী গুড়া ও চায়ের লিকার দিয়ে কালার বানিয়ে নিতে পারেন । এটির কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বরং চুলকে উজ্জ্বল করার পাশাপাশি ঘন,মজবুত করে।
আঁটসাঁট করে চুল না বাঁধা ও সঠিক বালিশ ব্যবহার
ঘুমের সময় বা দিনের যে কোন সময়ই খুব বেশি টাইট করে চুল বাঁধলে মাথার ত্বকে চাপ পড়ে,চুল নরম হয়ে যায়।তাই চুল সবসময় হালকা করে বাঁধুন।এছাড়া ঘুমানোর সময় সুতির পরবর্তে সিল্ক এর বালিশ ব্যবহার করুন। কারণ এতে সুতির ন্যায় আদ্রতা শোষণের ভয় থাকে না ।
চুল হল সৌন্দর্য্য ও সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। তাই চুলকে স্বাস্থ্যকর রাখতে রাত জাগা,ধূমপান,অত্যধিক তৈলাক্ত খাদ্য গ্রহণসহ খারাপ অভ্যাসগুলো পরিহার করে, টিপসগুলো মেনে চলে,সে অনুযায়ী পরিচর্য্যা করুন।কর্মব্যস্ততা ও ক্লান্তির দরুন সবার হয়তো নিজে পরিচর্যার সুযোগ নাও হতে পারে সেক্ষেত্রে মাসে ২ বার বিউটি স্যালুন গিয়ে চুলের স্পা,অয়েল ম্যাসাজ করাতে পারেন। এক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন ন্যাচারাল বা অর্গানিক বিউটি স্যালুনই বেছে নেয়া ভালো। সর্বোপরি এ কথা বলব, আপনার চুল ঘন,পাতলা, কোঁকড়া,সিল্কি,কালো,লালচে যাই হোক না কেন চুলকে ভালোবাসুন এবং যত্ন নিন, তবেই চুল থাকবে স্বাস্থ্যকর- প্রাণবন্ত।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি- ফ্রিপিক
https://m.timesofindia.com/life-style/beauty/top-20-natural-ways-for-great-hair/amp_articleshow/17474619.cms
https://www.wikihow.com/Have-Healthy-Hair?amp=1
https://www.medicinenet.com/how_can_i_make_my_hair_soft_and_silky/article.htm
https://www.diys.com/healthy-hair-tips/
পাঠকরা যা বলছেন

"আমি শুধু বলতে চাই আপনার নিবন্ধগুলির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! আমার প্রবলেম ছিল, এখানে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সাহায্য করেছে। আপনি আমাকে আশা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।"

"আমাদের মেইলিং তালিকায় সদস্যতা নিতে পৃষ্ঠার নীচে আপনার ইমেল ঠিকানা লিখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বশেষ বিষয়বস্তু, নতুন পণ্য এবং লেটেষ্ট ব্লগ এর নোটিফিকেশন দ্রুত পেতে পারেন ।"
লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?