মানুষের জীবনের অন্যতম এক কঠিন কাজ কোনটি বলতে পারেন? অনেকে হয়তো এর উত্তরটি অনেকভাবে দিবেন। কিন্তু যেই উত্তরই দিন না কেন অতীত মুছে ফেলা আমাদের জীবনের এক অন্যতম কঠিন কাজ। আজ আমরা এ কঠিন কাজটি কিভাবে করতে হয় এবং সেই সাথে অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা বাদ দিয়ে কিভাবে বর্তমানকে উপভোগ করা যায় সে বিষয়েই জানব।

বর্তমান উপভোগ করতে হলে প্রথমেই আমাদের যা করতে হবে তা হল অতীতকে মুছে ফেলা। আমাদের সবারই নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে হচ্ছে কেন অতীতকে ভূলে থাকা জরুরি।
অতীতকে অগ্রাহ্য করা
আপনি যদি অতীত নিয়েই পড়ে থাকেন তবে বর্তমান সময়ে আপনার সামনে কি কি সুযোগ বা সম্ভাবনা আছে তা দেখার বা চিন্তা করার সুযোগ হারিয়ে ফেলবেন।

অতীত এর ভাবনায় বিভোর হয়ে থাকলে ভবিষ্যত কোনো পরিকল্পনাও করতে পারবেন না।
আপনার কেমন লাগে বলুন তো- যখন কেউ আপনাকে পূর্বের কৃত ভুল এর জন্যে বার বার অপমান করতে থাকে? নিশ্চয়ই তখন খারাপ লাগে। আপনি যদি বিগত ঘটনা প্রবাহ দিয়ে কাউকে যাচাই করেন, তবে কখনোই মানুষের সাথে সুস্থ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে পারবেন না। কারণ মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর তাই ভুলে যেতে না পারলে মানুষকে ক্ষমা করে নতুনভাবে শুরু করার সুযোগ দেয়া যায় না ।

স্মৃতিশক্তি এবং অণুচিন্তার মাধ্যমে খারাপ স্মৃতি মনের মধ্যে পুষে রাখলে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবেন। ধরুন পূর্বে আপনার কোনো বন্ধু আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে। এখন আপনি যদি সবসময় ধোঁকা,প্রতারণার মত বিষয়গুলো মাথায় নিয়ে রাখেন তবে আপনি নেতিবাচক চিন্তায় অভ্যস্ত হয়ে পড়বেন।
নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর মধ্যে বসবাস করা শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ও ক্ষতিকর। University of Ohio এর গবেষকদের এক জরিপে দেখা যায় প্রতিনিয়ত নেতিবাচক চিন্তা করলে আমাদের শরীরে ইনফ্লামেশন বেড়ে যায়। এছাড়াও হার্টের সমস্যা, ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়াসহ শরীরবৃত্তিয় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।

মানসিক সুস্থতার জন্যও অতীতকে ভূলে থাকা জরুরি। আপনি যদি আগের দুঃখ,কস্ট,ক্ষোভ,ব্যর্থতা নিয়ে বসে থাকেন তবে আপনার আত্মবিশ্বাস কমে যাবে, অল্পতে রেগে যাবেন,কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলবেন, অন্যকে হিংসা করবেন, এর ফলে মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হবে, জীবন দুর্বিষহ হয়ে যাবে।

অতীত মুছে ফেলার উপায়
প্রায় প্রত্যেকেরই নানারকম হতাশা, তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। এগুলো এড়িয়ে চলার উপায়গুলো নিয়ে এবার আলোচনা করব-
বর্তমান পরিস্থির উন্নতির জন্য কাজ করা
পৃথিবী পরিবর্তনশীল। আমরা সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। এ সত্য কে মেনে নিয়ে কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকলে তা মুছে ফেলে বর্তমান পরিস্থিতির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। তবে ই জীবনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

নিজেকে ভালোবাসতে হবে
আপনি নিজেই যদি আপনার নিজের ক্ষতি করেন তবে কে আপনাকে বাঁচাতে পারবে? কেউ যদি নিজেকে ভালোবাসতে চায় তবে সে অতীত এর কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতা পুষে নিজেকে কস্ট দিবে না।

প্রার্থনা করুন ও কাছের কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির নিকট নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করুন
চেষ্টা করে দেখুন তো শ্বাস আটকে রেখে আপনি কতক্ষণ থাকতে পারেন? ২/৩ মিনিট এর বেশি কি থাকা যাচ্ছে? না,যাচ্ছে না। কারণ আমরা যে শ্বাস নেই তাও আমাদের ছেড়ে দিতে হয়, যে পানি পান করি বা খাদ্য গ্রহণ করি তাও শরীর থেকে বর্জ্য হিসেবে বের হয়ে না আসলে আমরা অসুস্থ হয়ে পড়ি। ঠিক একইভাবে মানসিক কোনো যন্ত্রণা ভোগ করলেও যদি তা ভেতরে আটকে রাখা হয় তবে আমরা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পরবো। তাই আমাদের উচিত কোনো দুঃখ হলে তা বিশ্বস্ত মানুষের কাছে শেয়ার করা এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে নিজের সমস্যার কথা বলে নিজেকে হালকা করা, যাতে নেতিবাচক চিন্তা আমাদের অন্তরে গেঁথে বিষাক্ত না করে তোলে।

সমস্যা নয়, সম্ভাবনা কে দেখতে শিখুন
আপনি যদি সমস্যাকেন্দ্রীক মানুষ হয়ে থাকেন, তবে শুধু সমস্যাই দেখবেন। আর সম্ভাবনাময়ী হয়ে থাকলে আপনি সকল সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী হবেন, সে অনুযায়ী কাজ করবেন, আশাবাদী হয়ে জীবণকে সুন্দর করবেন। এভাবে সমস্যার সম্ভাবনাকে দেখার অভ্যাস গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে অতীতকে দূরে ঠেলে দিতে পারবেন।

নেতিবাচক মানুষের সাথে দূরত্ব বজায় রাখা
নিজের সুস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে হলেও নেতিবাচক মানুষের সাথে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে এবং আশাবাদী, ইতিবাচক মানুষের সাথে বেশি বেশি মিশতে হবে । তারা আপনাকে অতীত ভুলে নতুন করে বাঁচার আশা দিবে, আলো দেখাবে।

ইতিবাচক মানুষ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে
প্রতিদিন নিজের সাথে ইতিবাচক কথোপকথন আমাদের অতীত ভুলতে সাহায্য করে। যেমন- আমি পারবো, আমি মানসিকভাবে শক্তিশালী, আমি ভালো আছি, আমি সুস্থ আছি এ কথাগুলো বারবার অনুশীলন করুন।

মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতে হবে
সেবা পরম ধর্ম। অপরের সেবা করার কথা মাথায় রাখলে নিজের দুঃখকষ্টকে অনেক টাই ভুলে থাকা সম্ভব। যেমন- আপনি যদি পশুপাখি পালন করেন, গাছপালার যত্ন নেন তবে নিজের দুঃখকষ্টের মধ্যে থেকেও প্রতিদিন তাদের যত্ন নেয়ার কথা ভাববেন।
অতীত এর পাশাপাশি ভবিষ্যত নিয়েও দুশ্চিন্তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তবে মানসিক,দৈহিক কোনোভাবেই শান্তি পাওয়া যাবে না।

ভবিষ্যত নিয়ে দুশ্চিন্তা
আমরা যা জানি না তা নিয়ে আমাদের সবার মধ্যেই উৎকন্ঠা কাজ করে। উৎকন্ঠা কে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ক্ষতিগুলো জেনে নেই-

শারীরিক অসুস্থতা
ভবিষ্যতে নিয়ে বেশী দুশ্চিন্তা করলে শরীরে নানারকম রোগ সৃষ্টি হয়। যেমন-আলসার, টুথ ক্যাভিটি, মাথাব্যথা, হাড় ব্যথা ইত্যাদি।
Doctor W.C. Alvarez from Mayo clinic said, “Ulcers frequently flare up or subside according to the hills and valleys of emotional stress”
অর্থাৎ এ থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে আলসার এর একটি কারণ হল ইমোশনাল স্ট্রেস।
দুশ্চিন্তা আমাদের পাকস্থলীর এসিড নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে যা,হার্টবার্ন এর একটি কারণ।
আমাদের রোগ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অনেকাংশেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

মানসিক অসুস্থতা
বেশি দুশ্চিন্তা করলে নানারকম মানসিক সমস্যার শিকার হতে হয়। অত্যধিক দুশ্চিন্তা করলে রাতে ঘুমের সমস্যার জন্য মাইগ্রেনের ব্যথা বেড়ে যায়, কোন কাজ এ মনোনিবেশ করা যায় না,হতাশাগ্রস্ত হয়ে নেতিবাচক চিন্তা বাসা বাঁধে।

ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করুন দুশ্চিন্তা নয়
সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখা
সকল ধর্মেই সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখার কথা বলা হয়েছে, আল কোরআন এ বর্ণিত হয়েছে -“নিঃসন্দেহে আল্লাহর রহমত থেকে কাফের সম্প্রদায় ছাড়া আর কেউ নিরাশ হয় না।(সূরা ইউসুফঃ৮৭)
হিন্দুধর্মের পবিত্র গ্রন্থ গীতায় বলা হয়েছে –“কর্ম করে যাও,ফলের কথা ভাববে না” সমস্যার মধ্যে পড়লে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখতে হবে, বিশ্বাস করতে হবে সৃষ্টিকর্তা সাহায্য করবেনই ।

শারীরিক ব্যয়াম করা
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে,নিয়মিত শরীরচর্চা করলে ইনসমনিয়া,উদ্বেগ,অবসাদ কমে যায়, আত্মসম্মান ও বাড়ে।
লেখালেখি করা
প্রতিদিন কমপক্ষে ২ মিনিটও নিজের জীবনের মধুর ঘটনাগুলো লেখার অভ্যাস করলে মানসিক শক্তি বাড়ায়, দুশ্চিন্তা কমায়।
বর্তমানে কেন বাঁচবো?
বর্তমান এর ইংরেজি শব্দ “Present”.আর present এর বাংলা “উপহার”।বর্তমান সত্যিই আমাদের জন্য উপহার।

সিদ্ধান্তগ্রহণে সহায়তা
অতীতের ঘটনায় আটকে না থেকে, ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা না করে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মনোযোগী হলেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়।
সম্পর্কের উন্নয়ন
বর্তমানে বাঁচতে শিখলে মানুষকে ক্ষমা করা যায়,সম্পর্কের উন্নয়ন হয়।
কৃতজ্ঞ হওয়াঃ
বর্তমানে বাঁচতে শিখলে কৃতজ্ঞ হওয়া যায়, ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।

শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা
শারীরিকভাবে যেমন সুস্থ থাকা যায়,তেমনি মানসিক শক্তি ও বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান উপভোগের উপায়
বর্তমান উপভোগের উপায়গুলো হল-
কর্মমুখী হওয়া
“অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বুদ্ধি”।তাই অযথা সময় নস্ট না করে কর্মের মধ্যে থাকলে বর্তমান উপভোগ করা যায়।

একাকী সময় কাটানো
রুপচর্চা,ব্যয়াম ইত্যাদির মাধ্যমে নিজের সাথে সময় কাটালে বর্তমান উপভোগ্য হয়।
পরিস্থিতি মেনে নেয়া
বর্তমান উপভোগ করতে চাইলে সত্য মেনে নিতে হবে ,সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
পূর্ণ মনোযোগ
যে কাজ করবো তাতে মনোযোগী হওয়া।যেমন-খাওয়ার সময় এর গন্ধ,স্বাদ,রং ইত্যাদি খেয়াল করা।

সামাজিক যোগাযোগঃ
নতুন নতুন মানুষের সাথে সময় কাটানো,পুরানো বন্ধুদের খোঁজ নেয়া এরকম সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করা বর্তমানে বাঁচতে শেখায়
শখের কাজ করা
রান্না, বইপড়া, ছবি আঁকা,বাগান করা ইত্যাদির মাধ্যমে বর্তমানকে খুব সুন্দরভাবে উপভোগ করা যায়।

কৃতজ্ঞ হওয়া
প্রতি মুহূর্তে প্রাপ্ত উপাদান এর জন্যে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলে বর্তমান উপভোগ করা যায়।
ভ্রমণ করা
বর্তমানে বাঁচতে হলে প্রকৃতি, দেখতে হবে, সূর্যস্নান করতে হবে।
প্রার্থনা করাঃ
সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনা,যেমন-নামাজ,রোজা,পূজা ইত্যাদি কর্মকান্ড বর্তমানকে উপজীব্য করে।
শ্বাস প্রশ্বাস এর ব্যয়ামঃ
প্রাণায়াম,কপালভাতি,ইয়োগা ইত্যাদি কাজকর্মের মাধ্যমে বর্তমানে থাকা যায়।

রুটিন পরিবর্তন করা
ডান এর পরিবর্তে বাম হাত,চেনা রাস্তার বিপরীতে নতুন রাস্তা ব্যবহার করলে বর্তমানে মনঃসংযোগ বাড়ে।
মানুষের প্রশংসা করা
সুন্দর এর প্রশংসা করা,মানুষকে হাসতে সাহায্য করার মাধ্যমে বর্তমান উপজীব্য হয়।
দয়ালু হওয়া
অসুস্থের সেবা করা,ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান,স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণ প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ্য করে তোলে।

হাসতে শিখুন
মন খারাপ হলে,হতাশ লাগলে নিজেকে হাসতে অনুপ্রাণিত করুন।এতে করে বর্তমানমুখী হওয়া যায়। সময়কে কি বেধে রাখা যায়? পরিবর্তনশীল এ সংসারের পরিবর্তন এর সাথে মানিয়ে চলতে পারলেই জীবিত থাকা যায়।মৃত্যু একবার না বার বার হয়,যদি আমরা বর্তমানকে উপভোগ করতে না পারি।তাই চলুন জীবনের ছোট বড় সব প্রাপ্তি গণনা করি,বর্তমানকে উপভোগ করি।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
ছবি- ফ্রিপিক
https://adaa.org/understanding-anxiety/related-illnesses/other-related-conditions/stress/physical-activity-reduces-st
https://www.verywellmind.com/how-do-you-live-in-the-present-5204439
https://www.healthline.com/health/anxiety/effects-on-body
পাঠকরা যা বলছেন

"আমি শুধু বলতে চাই আপনার নিবন্ধগুলির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! আমার প্রবলেম ছিল, এখানে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সাহায্য করেছে। আপনি আমাকে আশা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।"

"আমাদের মেইলিং তালিকায় সদস্যতা নিতে পৃষ্ঠার নীচে আপনার ইমেল ঠিকানা লিখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বশেষ বিষয়বস্তু, নতুন পণ্য এবং লেটেষ্ট ব্লগ এর নোটিফিকেশন দ্রুত পেতে পারেন ।"
লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?