আমরা নারকেল তেল ব্যবহার বলতে শুধুমাত্র চুলে ব্যবহার করাকেই বুঝি। কিন্তু এটা অনেকেই জানি না, চুলের পাশাপাশি রান্নায় এমনকি ত্বকের প্রসাধনী ব্যবহার করা যায়। যদি কেউ এসব কথা জেনেও থাকি, তবে জানার যথেষ্ট কমতি রয়েছে, এটা নিরপেক্ষভাবে মানতে হবে। কেননা নারকেল তেলের বহুমুখী ব্যবহার ও উপকারিতা জানা থাকলে নিশ্চয়ই কখনোই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এই তেলের ব্যবহার এভাবে কমিয়ে ফেলতাম না। যাইহোক জানা – অজানা যেমনি থাকুক , আজকের লেখায় নারকেল তেল সম্পর্কে নতুন করে জানব।

প্রথমেই জেনে নেয়া যাক, নারকেল তেল সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক তথ্য। নারকেল তেল নারকেলের শাঁস থেকে নিষ্কাশন করা হয় এবং নিষ্কাশিত তেলের ৯৯% ফ্যাট, যার প্রধান অংশ সম্পৃক্ত চর্বি হলেও এর সাথে মিশ্রিত থাকে লরিক এসিড, সাইরিস্টোলেইক এসিড,পামিটোলেইক এসিড। তবে নারকেল তেলে ফাইটোস্টেরল বেশি থাকে এবং এতে উচ্চ সম্পৃক্ত চর্বির কারণে ধীরে ধীরে জারিত হয়। এই বৈশিষ্ট্যের জন্যে নারকেল তেল অন্যান্য তেলের তুলনায় বেশী উপকারী ও উপযোগী।
নারকেল তেল আমরা কয়েকভাবে ব্যবহার করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, রান্নায় ভোজ্য তেল হিসাবে , যা খাদ্যের সাথে দেহে প্রবেশ করলে শরীরবৃত্তীয় বিভিন্ন উপকারে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়। যেমন-

হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ
আমাদের দেহে দুই ধরনের কোলেস্টেরল আছে। একটি HDL (এইচডিএল) ও অপরটি LDL ( এলডিএল) । দেহের জন্য উপকারী কোলেস্টেরল HDL এবং দেহের জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরল LDL । সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এ তেল ক্ষতিকর এলডিএল কে রুপান্তর করে এইচডিএল কোলেস্টেরলে পরিণত করে। যেহেতু এলডিএল কোলেস্টেরল রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে , ফলশ্রুতিতে এটি হৃদরোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নারকেল তেল এলডিএল কোলেস্টেরলকে এইচডিএল কোলেস্টেরলে পরিণত করে এবং হৃদরোগ ও রক্তচাপ সহজেই প্রতিরোধ হয়।
প্রদাহ ও আর্থ্রাইটিস
খাদ্যের ভিন্নতায় পরিপাক ক্রিয়া ভিন্ন হাওয়াই স্বাভাবিক। এই পরিপাক ক্রিয়া চলাকালীন পাকস্থলীর গ্যাস্ট্রিক গ্রন্থি থেকে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসরিত হয়। হাইড্রোক্লোরিক এসিডের তীব্রতায় পাকস্থলীতে প্রদাহ সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় নারিকেল তেল ভোজ্য তেলের সাথে খাওয়া হলে এটি হাইড্রোক্লোরিক এসিড নিঃসরণ নিয়ন্ত্রিত হয় । যার ফলে পাকস্থলী প্রদাহ কমে।
এবার আসি আর্থ্রাইটিস প্রসঙ্গে। আজকাল এ সমস্যাগ্রস্ত রোগীর সংখ্যা চোখে পড়ার মত। আর্থ্রাইটিস মূলত হাড়ের ভঙ্গুরতা ও পায়ে, কোমরে, হাতে প্রচুর ব্যাথা সৃষ্টি করে। এ অবস্থায় নারকেল তেল মালিশ হিসাবে ব্যবহার করলে আর্থ্রাইটিস ব্যথা কমাতে বেশ কার্যকর হয়।
টাইপ 2 ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
টাইপ 2 ডায়াবেটিস মূলত ইনসুলিন প্রতিরোধী। যা ইনসুলিন উৎপন্নে বাধা দেয়। নারকেলে থাকা MCF এ বাধা দেওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলশ্রুতিতে দেহে ইনসুলিন উৎপন্ন হয় এবং টাইপ 2 ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রিত হয়।

ওজন কমাতে
দেহের অতিরিক্ত ওজন মানেই কম বেশি দুশ্চিন্তা। কেননা এটি দেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। দেহের এই অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধিতে এলডিএল চর্বির ভূমিকা মুখ্য । সবচেয়ে মজার বিষয়, নারকেল তেলে থাকা স্যাচুরেটেড চর্বি দেহের অতিরিক্ত ওজনকে কমিয়ে ফেলে, যা দেহের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে।
ইমিউন সিস্টেম প্রতিরক্ষা
পূর্বে জেনেছি, এ তেলে প্রচুর পরিমাণে লরিক এসিড থাকে যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করতে সক্ষম। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এন্টিজেন হিসেবে দেহে প্রবেশ করে এরা ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে। নারকেল তেলে থাকা লরিক এসিড এন্টিজেনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ইমিউন সিস্টেমের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হয়।

চুল সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার প্রতীক। সেই সাথে এটি মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। বৈজ্ঞানিকভাবে চুলের তিনটি স্তর রয়েছে। যেমন- মেডুলা, কর্টেক্স ও কিউটিকল। মেডুলা চুলের কেন্দ্রীয় অংশ। কর্টেক্স হল চুলের সবচেয়ে ঘন স্তর এবং কিউটিকল চুলের শক্ত প্রতিরক্ষামূলক বাইরের স্তর। নারকেল তেল এই তিনটি স্তরের উৎকর্ষতা সাধনে কাজ করে।। এছাড়া আরো কয়েকটি কাজ করে। যেমন-
উকুন প্রতিরোধে
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পারমেক্সিন নামক রাসায়নিক উকুন নাশক থেকে প্রাকৃতিক নারকেল তেল উকুন প্রতিরোধে ৪০% বেশি কার্যকর। এটি ব্যবহার করলে উকুন বংশবিস্তার বিনাশ হয় এবং উকুন প্রতিরোধ হয়।
UV থেকে চুলের সুরক্ষা
সূর্যের আলো থেকে আগত UV রশ্মি চুলের ক্ষতি করে। নারকেল তেল ব্যবহার করলে চুলের উপর এক তৈল আবরণ সৃষ্টি করে যা UV রশ্মি কে প্রতিরোধ করে।
খুশকি নির্মূলে
খুশকি নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। মাথার ত্বকে ইস্টের বংশবিস্তারের জন্য এটি হয়। নারকেল তেলে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য থাকায় সহজেই ত্বকের ইস্টের বংশবিস্তার রোধ করতে পারে। ফলে এটি খুশকি নির্মূলে বেশ কার্যকর হয়।
চুল পড়া প্রতিরোধে
অতিরিক্ত গ্রুমিং এর কারণে চুল পড়ে। নারকেল তেলে থাকা এন্টি এক্সিডেন্ট অতিরিক্ত গ্রুমিং কে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে চুল পড়া কমে।

মানুষ সৌন্দর্যের পূজারী। বাহ্যিক সৌন্দর্যে মানুষকে প্রাথমিকভাবে মূল্যায়ন করে। হয়তো সহজে বুঝতে পারছেন বাহ্যিক সৌন্দর্য বলতে ত্বকের কথাই বলছি। ত্বকের সৌন্দর্য রক্ষা ও চর্ম সমস্যার ক্ষেত্রে নারকেল তেল বেশ কার্যকর ও উপযোগী। কয়েকটি উদাহরণের কথা না বললেই নয়।
দাঁদ নিরাময়
নারকেল তেলে এন্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট আছে। অপরদিকে দাঁদ ছত্রাকের বংশবিস্তারে হয়ে থাকে। এ তেলে থাকা এন্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট ত্বকে ছত্রাকের বিস্তারকে প্রতিরোধ করে। ফলে দাদ রোগ নিরাময় হয়।
ব্রণ
নারকেল তেল ত্বকের ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। সেই সাথে এতে এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় ব্রণ থেকে ত্বককে রক্ষা করে এবং ত্বকের মসৃণতা ধরে রাখে।
ব্যবহার টিপস
ত্বকে ব্যবহার
এক কাপ নারকেল তেল ও এক চামচ মধু মিশ্রিত করুন।তারপর মুখে ও ত্বকে সমানভাবে মেখে দিন। অন্তত আধা ঘন্টা পর ধুয়ে ফেলুন এবং শুকনো টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছে ফেলুন।
আরেকভাবে ব্যবহার করতে পারেন। এক চামচ নারকেল তেল এবং এক চা চামচ বেকিং সোডা একসাথে মিশিয়ে পেস্টের মত বানান। তারপর মুখে ও ত্বকে মাসাজ করুন। কিছুক্ষণ পর ধুয়ে ফেলুন এবং টাওয়াল দিয়ে পানি মুছে ফেলুন।এভাবে দুই সপ্তাহ ব্যবহার করলে মুখের দাগ কমবে এবং ত্বক উজ্জ্বল ও লাবণ্যময় হবে।

ম্যাসাজ
বাত ব্যথা বা ক্ষত নিরাময় কিংবা ত্বকের উজ্জ্বলতার জন্য মালিশ হিসেবে এ তেলের রয়েছে বেশ উপকারিতা। পেঁয়াজের রস ও নারকেল তেল একসাথে মিশিয়ে মালিশ হিসেবে ব্যবহার করলে বেশ উপকার পাওয়া যায়। এভাবে চার সপ্তাহ ব্যবহার করতে থাকুন।
চুলে ব্যবহার
প্রাকৃতিক নারকেল তেল অন্যান্য তেলের মতোই ব্যবহার করবেন। যেকোনো তেলই হোক ঘ্রাণ ও বর্ণ দেখে ব্যবহার করুন। তেল যদি দ্রুত জমে যায় তাহলে বুঝবেন এটা খাঁটি তেল নয়। যাই হোক, চুলে ব্যবহারের ক্ষেত্রে , নারকেল তেলের সাথে লেবুর রস মিশ্রিত করে ব্যবহার করুন। কারণ লেবুর রসে রয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি। যা চুলের গোড়াকে মজবুত করে এবং চুল পড়া রোধ করে।

শীতকালীন ব্যবহার ও উপকারিতা
শীতের হিমেল হাওয়া প্রকৃতির সকল সত্ত্বাকে নতুন আমেজ আন্দলিত করে। আমাদের দেহ ,মন-প্রাণ এমনকি ত্বকও সেই একই ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়। যার ফলে সব বয়সের মানুষের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায় , এমনকি ফাটল দেখা দেয়। এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে একটি বিশ্বস্ত সঙ্গী থাকলে মন্দ নয়, সে দিক থেকে সার্বিক বিবেচনায় নারকেল তেল সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সঙ্গী হতে পারে। কেননা নারিকেল তেলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ত্বকের কোলাজেনকে সতেজ রাখে। সেই সাথে , নেই কোনো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। তাই শীত মৌসুমে নারকেল তেল পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন সুরক্ষা দিবে।

আশা করি, লেখাটি পড়ে অন্তত এটা বুঝতে পারছেন, নারকেল তেলের ব্যবহার শুধুমাত্র চুলে সীমাবদ্ধ না রেখে রান্নায় , ত্বক প্রসাধনী কিংবা মালিশে ব্যবহার করা সময়ের দাবী। অন্যদিকে এ তেলের স্যাচুরেটেড ফ্যাট , এন্টি এক্সিডেন্ট ও এন্টি মাইক্রোবিয়াল গুণ থাকায় আমরা ত্বক, চুল ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যবহার করতে পারি। অতএব নারকেল তেল ব্যবহার করুন , সুখী সমৃদ্ধ সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন।
তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)
https://www.medicalnewstoday.com/articles/282857
https://www.webmd.com/diet/coconut-oil-good-for-you
ছবি- ফ্রিপিক