001 10 linnet

একটা সময় গ্রামীণ জনপদে একটা রেওয়াজ ছিল যে ছোট বাচ্চাদের বুকে কালোজিরার পলিথিন বা কাপড়ের পুতলি বেঁধে রাখা হতো। ছোট বাচ্চা তখন তার আঙ্গুল বা অন্যকিছু মুখে না দিয়ে ওই কালোজিরার পুতলিটি মুখে দিত। এটি একদিকে যেমন বাচ্চাটির খেলনা সামগ্রী হিসেবে আনন্দের খোরাক হতো আবার অন্যদিকে শিশুর বুকে জমে থাকা কফ ও সর্দি নির্মূলে কাজ করতো ।

002 10 linnet

আবার ছোটবেলায় দেখতাম দাদি বা নানির বিছানার পাশে কালোজিরার ছোট বাক্স শোভা পেতো। শিশুদের ও বৃদ্ধদের একমাত্র অবলম্বন যেন কালোজিরা। সেই সময় চিকিৎসাব্যবস্থার তেমন উন্নত না হলেও মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ এর প্রতি নির্ভরশীলতা তাদের সুস্থতা ধরে রাখতে বেশি কার্যকরী ছিল। বর্তমান সময়ের কথা ধরি। চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতি যেমন হচ্ছে তেমনি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও দিন দিন কমছে। সেইসাথে গড় আয়ুও কমে গেছে। তাহলে এখন প্রশ্ন বর্তমান সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হলেও আগের মানুষের গড় আয়ু ও সুস্থতা কেন বেশী ছিল? সেই উত্তরের প্রসঙ্গে আজকে আলোচনা করব কালোজিরা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের সুস্থতার ধরে রাখার টিপস। তাহলে আসুন প্রথমেই জেনে নিই কালোজিরায় কি কি পুষ্টি উপাদান থাকছে।

কালোজিরার প্রধান পুষ্টি উপাদান

• আমিষ = ২১ %
• শর্করা = ৩৮ %
• স্নেহ বা চর্বি= ৩৫%
• ১ গ্রাম পরিমান কালোজিরায় পুষ্টি উপাদান
• আয়রন =১০৫ মাইক্রোগ্রাম
• ফসফরাস =৫.২৬ মিলিগ্রাম
• কপার= ১৮ মাইক্রোগ্রাম
• জিংক =৬০ মাইক্রোগ্রাম
• ফোলাসিন =৬১০ আইউ
• প্রোটিন = ২০৮ মাইক্রোগ্রাম
• ভিটামিন বি১= ১৫ মাইক্রোগ্রাম
• নিয়াসিন = ৫৭ মাইক্রোগ্রাম
• ক্যালসিয়াম = ১.৮৫ মাইক্রোগ্রাম
সহজভাবে বুঝতে চেষ্টা করি একটি মানুষের সুস্থতা নির্ভর করে তার দেহে প্রাপ্ত পুষ্টিগুণের উপর। তার দেহে ঐ সকল পুষ্টিগুণ যখন কিছু না কিছু পরিমাণ থাকবে তখন ওই ব্যক্তির দেহের সুস্থতা নিশ্চিত হয়। আর এটা আমরা ভালো করেই জানি যে একজন মানুষের দৈহিক সুস্থতা নিশ্চিত হলে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত হয়। একটা কথা প্রচলিত আছে “দেহ ভালো তো মন ভালো। “

007 10 linnet

কালোজিরা খাওয়ার উপকারিতা

১.রোগ প্রতিরোধ বৃদ্ধিতে কালোজিরা

আমরা মানুষ বর্তমানে রোগ প্রতিরোধের জন্য ফার্মাসিটিক্যাল এন্টিবডির উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছি। আমরা প্রাকৃতিকভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারি শুধুমাত্র নিয়মমাফিক কালোজিরা খেয়ে। দেহের ইমিউন সিস্টেমে কাজ করে কালোজিরা। দেহের অভ্যন্তরীণ এন্টিবডি তৈরি করে।আর এই এন্টিবডি দেহে প্রবেশিত এন্টিজেন কে মেরে ফেলে। যার প্রেক্ষিতে আপনাদের সুস্থতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত হয়।

২.মায়ের বুকের দুধ বৃদ্ধিতে কালোজিরা

আমাদের আত্মীয় স্বজন কিংবা পরিবারের সদস্যদের মাঝে দেখা যায় যে মায়ের বুকের দুধ সন্তান পর্যাপ্ত পাচ্ছেনা। মায়ের বুকে দুধ উৎপন্ন হচ্ছে কম।এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে আপনি ঘুমানোর আগে ০৫ থেকে ১০ গ্রাম কালোজিরা মিহি করে খেতে থাকুন। তাছাড়া যদি এভাবে খেতে না পারেন তাহলে কালোজিরা ভর্তা খেতে পারেন। দেখবেন আপনার বুকের দুধ উৎপন্ন হচ্ছে আর আপনার সন্তানের দুধ নিশ্চিত হচ্ছে।

005 11 linnet

৩.জ্বর, ব্যথা, সর্দ, কাশি নিরাময় কালোজিরা

কালোজিরার ব্যবহার যার ব্যথা, সর্দি, কাশি নিরাময় অব্যর্থ কার্যকর। এক চামচ কালোজিরার সাথে তিন চামচ মধু ও দুই চামচ তুলসীপাতার রস মিশিয়ে প্রতিদিন সেবন করতে পারেন। আপনার জ্বর, সর্দি, ব্যথা দেখবেন কয়েক দিনের মধ্যেই নিরাময়।

৪.ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কালোজিরা

কালোজিরার একটি বিশেষ গুণ হলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা ঠিক রাখব। যার প্রেক্ষিতে আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করবে। ডায়াবেটিস রোগীরা এক চিমটি পরিমাণ কালোজিরা এক গ্লাস পানির সাথে মিশিয়ে প্রতিদিন খেতে পারেন। দেখবেন আপনার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে।

৫.চুল পড়া রোধে কালোজিরা

বর্তমানে চুল পড়া একটি স্বাভাবিক কারণ হয়ে গেছে। চুল পড়ার কারণ এর সাথে ভিটামিন বি বারো এর ঘাটতি জড়িত। সেইসাথে পরিবেশ দূষণের ফলে পরিবেশে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের চুল পড়া কে প্রভাবিত করে। প্রাকৃতিক মহাঔষধ কালোজিরা প্রতিদিন এক চিমটি পানির সাথে মিশিয়ে খেলে চুল পড়া রোধে কার্যকর ।

006 11 linnet

৬.মস্তিষ্ক ঠান্ডা ও সতেজ রাখতে কালোজিরা

আমাদের মাঝে এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা কিনা সামান্য ব্যাপারে উত্তেজিত হয়ে পড়েন। এমনকি মারমুখী হয়ে পড়েন। এ ধরনের মানুষের ক্ষেত্রে কালোজিরা বেশ উপকারী তিন বেলা হালকা কুসুম গরম পানির সাথে কালোজিরা খেলে নিশ্চয়ই তিনি কিছুটা হলেও উপকার পাবেন। কারণ মস্তিষ্ক ঠান্ডা ও সতেজ রাখতে শর্করা বা গ্লুকোজ দরকার। আর শর্করা বা গ্লুকোজের পরিমাণ কালোজিরাতে অধিক পরিমাণে রয়েছে।

৭.হজম শক্তি বাড়াতে কালোজিরা

আজকাল বদহজম বা পেট ফাঁপা দিন দিন বেড়েই চলছে মানুষের। এই বদহজম বা পেটফাঁপা থেকে বাঁচতে আপনি প্রাকৃতিক উপাদান কালোজিরা খেতে পারেন। তাই প্রতিদিন এক থেকে দুই চামচ বেটে পানির সাথে খেতে পারেন। যা আপনার হজম শক্তি বাড়াবে, সেই সাথে আপনার পরিপাক কাজকে সুন্দর ভাবে পরিচালিত করবে।

৮. বাতের ব্যথা দূরীকরণে কালোজিরা

কালোজিরার তেল আপনি মালিশ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। সেই সাথে এক চা-চামচ কাঁচা হলুদের রসের সাথে এক চা-চামচ কালোজিরার তেল এবং মধু বা রং চায়ের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন। যার উপকার কয়েকদিনের মধ্যে পেয়ে যাবেন।

004 12 linnet

৯.অতিরিক্ত চর্বি কমাতে কালোজিরা

আপনার ডায়েট বডি ধরে রাখার জন্য কালোজিরা বেশ কার্যকর। এজন্য আপনি প্রতিদিন ০৫ গ্রাম করে কালোজিরা খেয়ে আপনার মেদ বা চর্বি কমাতে পারেন।

১০.ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে কালোজিরা

ত্বকের ব্রণ বা দাগ দূরীকরণে বা ত্বকের উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে কালোজিরা বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন কর। আজকাল বিউটি পার্লারে ব্যবহৃত হচ্ছে ।

১১.অনিয়মিত মাসিক সমস্যা সমাধানে

অনিয়মিত মাসিক সমস্যা সমাধানে কালোজিরা বেশ উপকারি।নিয়মিত আপনি এক কাপ কাঁচা হলুদ রসের সাথে বা সমপরিমাণ আতপ চাল ধোয়া পানির সাথে এক কাপ চা চামচ কালোজিরা মিশিয়ে খেতে পারলে আপনার মাসিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়ে যাবে।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে কালোজিরার উপকারিতা

আবু হোরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম বলেছেন ,
“কালোজিরা সকল প্রকার রোগের উপশম হয়, তবে মৃত্যু ব্যতীত।”

মহানবী সাল্লাল্লাহু সালামের জীবনে নিয়মিত কালোজিরা খেতেন । সেইসাথে তিনি সাহাবীদেরও তাগিদ দিতেন। ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে কালোজিরা খাওয়া বেশ কার্যকরী। তাছাড়া বৈজ্ঞানিকভাবে কালোজিরার গুরুত্ব বর্ণনা ইতিমধ্যেই করেছি। ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কালোজিরা দৈহিক ও মানসিক সুস্থতায় সহায়ক।

003 9 linnet

কালোজিরা খাওয়ার পদ্ধতি

আপনি আপনার ইচ্ছামতো যেকোনো ভাবে কালোজিরা খেতে পারেন। তবে কালোজিরার স্বাদ এ একটু ভিন্নতা আছে বলে অনেকে সহজে খেতে পারে না। যেমন, শিশুরা। তাই যারা খেতে না পারে তারা কালোজিরা মধু কিংবা চিনির সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন।তাছাড়া কালোজিরা ভর্তা করে খেতে পারেন। আবার বিভিন্ন ধরনের পিঠা, তরকারি রেসিপি তে ব্যবহার করতে পারেন অর্থাৎ মূলকথা পেটে গেলেই হলো।

কালোজিরার তেল

কালোজিরার তেলে একশটিরও বেশি উপকারী উপাদান রয়েছে। আমরা কয়েক ভাবে তেল ব্যবহার করতে পারি।

১.মধু আর কালোজিরার তেল
২. পানি ও কালোজিরা।
৩.রসুন ও কালোজিরার।
৪. টক দই ও কালোজিরা

কালোজিরা শ্বাস প্রতিক্রিয়া বা ক্ষতিকর প্রভাব আবিষ্কার না হলে এর স্বাদে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।তাই শিশুর ক্ষেত্রে খাওয়ানোর সময় মিষ্টি জাতীয় মিশ্রন ব্যবহার করতে হবে।

এক সময় রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একবারে শেষ হয়ে যাবে। তখন কোন এন্টিবডি দেহের রোগ নিরাময়ে কাজ করবে না। অতএব সে অনাগত জীবননাশের ভবিষ্যৎ থেকে রক্ষা পেতে প্রাকৃতিক ভেষজ উদ্ভিদের গুনকে কাজে লাগানো দরকার। আর তারই অংশ হিসেবে কালোজিরা খান ও সুস্থ জীবন গড়ে তুলুন।

তথ্যসূত্র: (লেখায় ইংরেজি কনটেন্টের বাংলা সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে)

ছবি- ফ্রিপিক

https://www.rkrnewsbd.xyz/2022/01/kalojirar-upokarita-o-khayar-niyom.html

পাঠকরা যা বলছেন

A side profile of a woman in a russet-colored turtleneck and white bag. She looks up with her eyes closed.

 

জিনিয়া পারভীন

"আমি শুধু বলতে চাই আপনার নিবন্ধগুলির জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ! আমার প্রবলেম ছিল, এখানে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য অত্যন্ত সাহায্য করেছে। আপনি আমাকে আশা এবং দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।"


0011 linnet

"আমাদের মেইলিং তালিকায় সদস্যতা নিতে পৃষ্ঠার নীচে আপনার ইমেল ঠিকানা লিখতে ভুলবেন না, যাতে আপনি সর্বশেষ বিষয়বস্তু, নতুন পণ্য এবং লেটেষ্ট ব্লগ এর নোটিফিকেশন  দ্রুত পেতে পারেন ।"

লিখাটি নিয়ে আপনার অভিমত কি?

Shop at Linnet
Total
0
Shares

Leave a Reply